Wednesday, July 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

তুলনার অসুস্থ প্রতিযোগিতা শিশুর মনে ফেলে বিরূপ প্রভাব

ক্রমাগত তুলনা শিশুর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তার মধ্যে দানা বাঁধতে পারে আত্মবিশ্বাসের অভাব

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৩, ১২:২৬ পিএম

বাবা-মা চান সন্তানের সাফল্য। তাদের চেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষীই বা কে আছে? সন্তান যাতে সর্বোচ্চ সফল হতে পারে, সেজন্য সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও চেষ্টা করতে পিছপা হনন না তারা। তবে এই “ভালো চাওয়া” কখনো কখনো রূপ নেয় অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। নিজের অজান্তেই অভিভাবকরা শিশুদের বানিয়ে ফেলেন “রেসের ঘোড়া”।

তারা চান এই ঘোড়া দৌড়ে প্রথম হবে, টানবে সবচেয়ে ভারি বোঝা। কিছু বিষয়কে মানদণ্ড ধরে অথবা অন্য কারও অর্জনকে মাপকাঠি ধরে কেউ কেউ চান তার সন্তানও “ওদের মতো হোক”। এখান থেকেই শুরু হয় তুলনা।

‘ওর মতো হও'/‌‌‘অমুক পারলে তুমি কেন পারবে না?'

প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব সবসময়ই খারাপ না। শিশুদের মধ্যে ভালো করার, নিজেকে গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা যোগাতে এটি প্রয়োজন। তবে ক্রমাগত তুলনা শিশুর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তার মধ্যে দানা বাঁধতে পারে আত্মবিশ্বাসের অভাব। একই সঙ্গে বিষয়টি শিশুর আত্মসম্মানেও আঘাত হানতে পারে।

“আমি অন্যদের তুলনায় অযোগ্য”- কোনোভাবে এমন ধারণা শিশুর সরল মনে গেঁথে বসলে সেই ক্ষত নিরাময় করা কঠিন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এতে শিশু হয়ে উঠতে পারে আগ্রাসী ও বৈরি মনোভাবাপন্ন। তার ভেতরে গেঁথে বসতে পারে চিরস্থায়ী বিরক্তি। এসব বিষয় শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর. ড. নিলুফার আখতার জাহানের মতে, “অন্য কারও সঙ্গে সন্তানের তুলনা করা বন্ধ করতে হবে। সন্তানের দক্ষতা বোঝার জন্য তুলনা একটি সাধারণ পদ্ধতি।”

“পাশের বাসার ছেলেটা অংকে ৯০ নম্বর পেয়েছে” বা “পাড়ার পিংকি গানের প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে”, “অন্য বাচ্চাদের থেকে কিছু শেখো”, এসব কথার ধরন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কঠিন। আপনার উদ্দেশ্য হয়ত সন্তানকে আঘাত করা নয়। কিন্তু অজান্তেই এসব কথা বিবৃতিগুলো ভালোর চেয়ে বেশি ক্ষতি করে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, অতিরিক্ত তুলনা করার মানসিকতা সন্তানের পাশাপাশি আপনার ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। এমন ধ্যান-ধ্যারণা সাধারণ বিষয়গুলোকেও কঠিন করে তোলে। শিশুদের মধ্যে “আমি কিছুই পারি না” মনোভাব সৃষ্টি হয়।

প্রতিটি শিশুদের প্রতিভা, আগ্রহ, বিকাশ এবং সামর্থ্যের জায়গা ভিন্ন। অভিভাবক বিশেষ করে বাবা-মা যেমন তাদের এই জায়গাগুলো শক্তিশালী করে তুলতে পারেন। আবার তাদের কারণেই একটি সম্ভাবনাময় জীবন অঙ্কুরেই হতে পারে বিনষ্ট।

শিশু-কিশোরদের ভাবনা

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাহাদের (১৫) কথায়, “আব্বু-আম্মু যখন বন্ধুদের কথা তুলে আমাকে বকা দেয় তখন আমার অনেক মন খারাপ হয়। আম্মু বলে, সবাই পারলে আমাকেও পারতে হবে। আমি হয়ত পারছিও, কিন্তু তাতে সবাই খুশি হয় না। খুব মন খারাপ হয়। তখন আর পড়তেও ভালো লাগে না।”

রাবেয়া ইসলামের (১৪) ভাষ্য, “পরীক্ষায় কম পেলে মা সবসময় অন্যদের কথা বলে। স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সবাই অংশ নেয়, আমি না গেলে মা বকা দেয়। কিন্তু আমার ওসব ভালো লাগে না, এটা মা বোঝে না। মা অন্য কারো উদাহরণ দিয়ে বকাঝকা করলে তখন আর ওই মানুষগুলোর সঙ্গেও মিশতে ইচ্ছে করে না।”

“আমার মনে হয় একা থাকতে পারলে মা আর কোনো কিছু নিয়ে কারও সঙ্গে তুলনা করে কথা বলতে পারবে না।”

বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা ট্রিবিউনের। শৈশবে তুলনার ‍”‍শিকার” এসব মানুষ নিজেদের “ভুক্তভোগী” বলে মনে করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন একজন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “শৈশবে সব বিষয়ে ক্রমাগত তুলনা একটি শিশুর মনোজগতকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে। সব ধরনের দক্ষতার ভিত্তি অর্জন শুরু হয় শৈশব থেকে। এই বয়সে কারো মনে ‘আমি পারব না' জাতীয় ধারণার জন্ম হলে তার ভবিষ্যৎ হয়ে উঠতে পারে দুর্বিষহ।”

যেভাবে দেখছেন অভিভাবকরা

পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। কোনো কোনো অভিভাবক বিষয়টির নেতিবাচক দিকটি অনুধাবন করতে পারছেন। 

রুবিনা নামে এক অভিভাবকের মতে, “আমরা মনে করি অন্য বাচ্চার সঙ্গে তুলনা করে নিজের সন্তানকে অনেক কিছু শেখাব। কিন্তু আসলে এটা ভুল ধারণা। যে যেমন, সে তেমনই থাকবে। চাইলেই কাউকে অন্যের মতো বানানো যায় না। অতিরিক্ত চাপের কারণে শিশুর মধ্যে যতটুকু আগ্রহ বা যোগ্যতা থাকে তাও নষ্ট হয়ে যায়।”

আসমা ইসলাম নামে আরেকজনের ভাষ্য, “আমরা তো তুলনা করছি না। অন্যের কথা বলে নিজের বাচ্চাকে উৎসাহিত করছি, এটা তো খারাপ কিছু না। এতে করে বাচ্চার মধ্যে আরও আগ্রহ বাড়বে।”

তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন ভিন্ন কথা- সন্তানকে কথা শোনানোর জন্য কিছুটা সময় দিতে হবে। তাদের চিন্তাধারা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। শিশুদের গঠনমূলক চিন্তা করা এবং নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত। এতে তাদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার মতো গুণাবলী বিকশিত হবে।

   

About

Popular Links

x