Saturday, July 11, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বন্যা-সহিংসতায় ঝুঁকিতে মানসিক স্বাস্থ্য: যেখানে পাবেন সেবা

বীভৎস বা ভয়ংকর ঘটনার ভিডিও-ছবি দেখেও মানুষ ট্রমায় ভুগতে পারেন

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৪, ০৬:৩১ পিএম

যেকোনো দুর্ঘটনাই প্রত্যক্ষ ক্ষতির পাশাপাশি পরোক্ষভাবেও কিছু প্রভাব রেখে যায়। হোক সেটি প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ কিংবা মানবসৃষ্ট কোনো সহিংসতা কিংবা দুর্ঘটনা। আর এই পরোক্ষ প্রভাবের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা অন্যতম।

ব্যক্তি যখন কোনো দুর্ঘটনা, সহিংসতা, দুর্যোগের শিকার হন, কিংবা মর্মান্তিকভাবে প্রিয় কারো মৃত্যু বা আহত হওয়া দেখেন; তখন সেটি তার মনের ওপর বেশ মারাত্মক রকমের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

অর্থাৎ যেকোনো ধরনের ভীতিকর ও কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতাই মানুষের মনে পরবর্তী সময়ে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। মানসিক স্বাস্থ্যের পরিভাষায় এটিকে বলা হয়, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি।

দুর্যোগ, দুর্ঘটনা কিংবা সহিংসতায় আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, নিহতদের স্বজন, প্রতক্ষ্যদর্শী; যে কেউই আক্রান্ত হতে পারেন এই সমস্যায়। এমনকি টিভি কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কোনো বীভৎস বা ভয়ংকর ঘটনার ভিডিও বা ছবি দেখেও মানুষ পিটিএসডিতে আক্রান্ত হতে পারেন।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুয়ায়ী দেশে কোটা আন্দোলন এবং সরকার পতনকে ঘিরে সাম্প্রতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন প্রায় ছয়’শ মানুষ। আহত হয়েছেন আরও অসংখ্য মানুষ। হতাহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, গণমাধ্যম কর্মী, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষ রয়েছেন। এছাড়াও ভয়াবহ সহিংসতার প্রত্যক্ষদর্শী আরও অসংখ্য মানুষ। এসব মানুষ ও তাদের স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী কিংবা সহপাঠীরা পরবর্তী সময়ে যে পিটিএসডি’তে আক্রান্ত হতে পারেন; সে শঙ্কা একবারেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই আহত ও প্রতক্ষ্যদর্শী এবং নিহতদের স্বজনদের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার বিষয়ে নজর দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে দেশে চলমান দেশের ১১ জেলায় চলমান বন্যায় এখন পর্যন্ত ১৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫০ লাখের বেশি মানুষ। এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, দূরে থাকা তাদের স্বজন কিংবা উদ্ধারকর্মীরাও পরবর্তী সময়ে পিটিএসডিতে আক্রান্তের ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তি নিজে কোনো কিছুর শিকার না হয়েও চোখের সামনে প্রিয় কেউ বা সম্পূর্ণ অজানা কারো প্রতি ভয়াবহ কিছু ঘটতে দেখলেও তার পিটিএসডি’তে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

তবে সবার ক্ষেত্রেই যে পিটিএসডি হবে তা নয়। এটি নির্ভর করে ঘটনার ভয়বহতা ও ঘটনা মোকাবিলায় ব্যক্তির মানসিক ক্ষমতার ওপর। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে, পুরুষের তুলনায় নারী এবং অপেক্ষাকৃত কমবয়সীদের পিটিএসডি’তে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস মেডিসিনের তথ্য বলছে, পিটিএসডি’তে আক্রান্ত হলে যে ঘটনার কারণে এটা হয়েছে একজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বারবার ওই ঘটনার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন এমন অনুভব করেন। কিংবা আবার ঘটতে যাচ্ছে এরকম আতঙ্কও বোধ করেন।

পিটিএসডি’র প্রভাব

পিটিএসডি’তে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে অন্যান্য মানসিক সমস্যা; যেমন- অবসাদ, তীব্র উদ্বেগ, মাদকাসক্তি কিংবা আত্মহত্যার চিন্তা দেখা দিতে পারে।

করণীয়

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি এমনিতেই বেশ উপেক্ষিত। তাই, পিটিএসডি‘তে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যে কারণে অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ এই সমস্যাটি চিহ্নিত হয় না।

আপনার পরিচিত কোনো ব্যক্তির মধ্যে যদি এই ধরনের কোনো উপসর্গ লক্ষ্য করেন তাহলে তার সঙ্গে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করুন এবং তাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে সহায়তা করুন। মনে রাখবেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সঠিক চিকিৎসায় পিটিএসডি নিরাময়যোগ্য। আর অবহেলায় ঘটতে পারে আরও করুণ কোনো পরিণতি।

তাই অবহেলা নয়, দেশে সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে হতে হবে সচেতন। আপনার পরিচিত কারো মধ্যে কোনো অসঙ্গতি দেখা দিলে তাকে নিয়ে যান নিকটস্থ কোনো মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে। চলুন, জেনে নেওয়া যাক ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে যেসব জায়গায় মানসিক স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া যায়, সেরকম কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য।

ঢাকার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট: এটি মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল। মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি মানসিক স্বাস্থ্য নীতিমালা নির্ধারণ, গবেষণা এবং চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের কাজ করে। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতিত প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত বর্হিবিভাগ থেকে ১০টাকা টিকেট কেটে সেবা নেওয়া যায়। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে ইনডোর, জরুরি বিভাগ ও বিশেষ ক্লিনিক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়: রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ব্লক ভবনের ১২ তলায় রয়েছে মনোরোগবিদ্যা বিভাগ। এই বিভাগে রয়েছেন দেশের খ্যাতনামা বেশ কয়েকজন চিকিৎসক। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতিত প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টাপর্যন্ত বর্হিবিভাগ থেকে টিকেটে কেটে সেবা নেওয়া যায়। এছাড়া বিভাগটিতে রয়েছে বৈকালিক সেবা। শুক্রবার ও ছুটির তিন ব্যতীত বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বর্হিবিভাগ থেকে সেবা নেওয়া যায়।

অন্যান্য সরকারি হাসপাতাল: এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহিদ সোহরাওয়ার্দি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে মানসিক রোগ বিভাগ। এসব হাসপাতালের বর্হিবিভাগ থেকে টিকেট কেটে নিতে পারবেন সেবা।

ঢাকার বাইরের সরকারি হাসপাতাল

রাজধানী ঢাকার বাইরে প্রত্যেকটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মানসিক রোগ বিভাগ রয়েছে। এছাড়া জেলা পর্যায়ে প্রতিটি সদর হাসপাতালে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা সেবা দিয়ে থাকেন। আর ঢাকার বাইরে মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষায়িত হাসপাতাল হলো পাবনা মানসিক হাসপাতাল। এসব হাসপাতালের বর্হিবিভাগ থেকে টিকেট কেটে নিতে পারবেন সেবা।

ঢাকার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান

মনের খবর ফর কেয়ার: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিদরা এই প্রতিষ্ঠানটি থেকে সেবা দিয়ে থাকেন। সরসারি ডাক্তার দেখানোর পাশাপাশি অনলাইনে দেশে-বিদেশের যেকোনো স্থান থেকে মনের খবর ফর কেয়ারের মাধ্যমে অনলাইনে সেবা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ঠিকানা: নাভানা বারেক কারমেলা - লেভেল ৩, ১১ মগবাজার রোড, ঢাকা ১২১৭

বাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিক কেয়ার: দেশের খ্যাতনামা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিদরা এখানে নিয়মিত রোগী দেখেন।

ইনসাইট সাইকো-সোশ্যাল কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ: এই প্রতিষ্ঠানটি থেকেও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং মনোবিদের পরামর্শ নেওয়া যাবে।

ঠিকানা: ৭১/১, পায়োনিয়ার রোড, সেগুনবাগিচা

আইকন কেয়ার লিমিটেড: মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং মনোবিদের পরামর্শের জন্য এখানে যেতে পারেন।

ঠিকানা: বাড়ি ৪৫, রোড ১৯, উত্তরা ১১

মনের বন্ধু: মানসিক সমস্যার সমাধানে কাউন্সেলিং বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কাউন্সেলিং সেবার জন্য মনের বন্ধুতে যেতে পারেন। এছাড়া সেবা দেওয়ার জন্য রয়েছে মনের বন্ধু অ্যাপ।

ঠিকানা: ২/১৬, ব্লক-বি, লালমাটিয়া

এছাড়াও রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতাল, ল্যাবএইড হাসপাতাল, সেন্ট্রাল হাসপাতালসহ বেশকিছু হাসপাতালে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত রোগী দেখেন।

 

   

About

Popular Links

x