Sunday, May 19, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কাশ্মীর নিয়ে কেন এতো বিবাদ, কী তার ইতিহাস?

গোটা কাশ্মীর উপত্যকা এই মুহূর্তে থমথমে। বিশ্ববাসীর চোখ এখন কাশ্মীরে, কী হবে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের পরিণাম?

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৯, ০৯:০৯ পিএম

ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরকে স্বায়ত্তশাসনের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারাটি বাতিল করেছে দেশটির সরকার।

সোমবার (৫ আগস্ট) ভারতের প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ এক প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের মাধ্যমে মুসলিম-অধ্যুষিত রাজ্যটির বিশেষ সুবিধা দেওয়া সাংবিধানিক আইনটি বাতিল করেন।

এ ছাড়াও জম্মু কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে দুই টুকরো করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জম্বু-কাশ্মীর থেকে লাদাখকে আলাদা করা হয়েছে। নতুন দুটি অঞ্চলেই দু’জন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের মাধ্যেমে কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে থাকবে। তবে জম্বু কাশ্মীরের জন্য আলাদা বিধানসভা রাখার কথা বলা হলেও লাদাখের বিধানসভা থাকবে না বলে জানানো হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির এই ঘোষণার আগেই, রবিবার রাত থেকেই রাজ্যের ফারুক-ওমর আবদুল্লা, মেহবুবা মুখতি, সাজ্জাদ লোনসহ অন্যান্য গুরত্বপূর্ণ নেতাকে গৃহবন্দী করা হয়। বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা, জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা ও কারফিউ।

গোটা কাশ্মীর উপত্যকা এই মুহূর্তে থমথমে। বিশ্ববাসীর চোখ এখন কাশ্মীরে, কী হবে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের পরিণাম? এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কাশ্মীর নিয়ে কেন এতো সংঘাত, কী তার ইতিহাস?

কাশ্মীরের ইতিহাস

পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত কাশ্মীরে হিন্দুধর্ম ও পরবর্তীতে বৌদ্ধধর্ম প্রভাব বিস্তার করে। নবম শতাব্দীতে গিয়ে কাশ্মীর উপত্যকায় শৈব ধর্মের উত্থান ঘটে। ১৩৩৯ সালে প্রথম মুসলিম শাসক শাহ মীরের হাত ধরে কাশ্মীরে ইসলামে বিস্তার হতে থাকে। এ সময় অন্যান্য ধর্মের প্রভাব হ্রাস পেলেও তাদের অর্জনসমূহ হারিয়ে না গিয়ে বরং মুসলিম অনুশাসনের সঙ্গে মিশে কাশ্মীরি সুফিবাদের জন্ম হয়। পরবর্তী সময়ে ১৮১৯ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় ৫০০ বছর মুসলিমরা কাশ্মীর শাসন করে। ১৮১৯ সালের শেষাংশে রঞ্জিত সিংহের নেতৃত্বে শিখরা কাশ্মীর দখল করে। ১৮৪৬ সালে কাম্মীরের তৎকালীন রাজা ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে গেলে রাজ্যটি ইংরেজদের হস্তগত হয়। তবে একটি চুক্তির মাধ্যমে গোলাব সিংহ ব্রিটিশদের কাছ থেকে ৭৫ লাখ রুপি এবং সামান্য বার্ষিক চাঁদার বিনিময়ে কাশ্মীর ক্রয় করেন এবং নতুন শাসক হন। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত গোলাপ সিংহের বংশধরেরাই কাশ্মীর শাসন করেছেন।

রাজনৈতিক দ্বদ্বের সূচনা

১৯২৫ সালে কাশ্মীরের রাজা হন হরি সিংহ এবং ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়া পূর্ব পর্যন্ত তিনিই ছিলেন কাশ্মীরের শাসক। ভারত বিভাগের অন্যতম শর্ত ছিল, ভারতের দেশীয় রাজ্যের রাজারা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবেন। আবার তারা যদি চান স্বাধীন থেকেও নিজেদের শাসনকাজ পরিচালনা করতে পারবেন। কিন্তু একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, হরি সিংহ ছিলেন হিন্দু রাজা, তিনি চাইছিলেন ভারতের সঙ্গে থাকতে। কিন্তু কাশ্মীরের জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশই ছিল মুসলিম। জনগণের বিরাট একটি চাইছিল পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে। এমনই এক দোলাচলে ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তান সমর্থিত পাকিস্তানের পশতুন উপজাতিরা কাশ্মীর আক্রমণ করে। 


আরো পড়ুন -  কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করলো ভারত


ঘটনায় হরি সিংহের সঙ্গে পশতুনদের যুদ্ধ শুরু হলে কাশ্মীরের রাজা ভারতের তৎকালীন গভর্নর-জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সহায়তা চান। বিনিময়ে হরি সিংহ ২৬ অক্টোবর এমন একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে যে তাতে উল্লেখ ছিল, হরি সিংহ ভারতের সঙ্গে যোগ দেবেন। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরই ভারতীয় সেনারা কাশ্মীরে প্রবেশ করে। অপরদিকে কাশ্মীরের পাকিস্তান প্রান্ত দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্য প্রবেশ করে।

প্রায় চার বছর যুদ্ধ চলার পর ১৯৫২ সালে জাতিসংঘ যুদ্ধ বিরতি হয়। যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব অনুসারে কাশ্মীর থেকে উভয় দেশের সৈন্য প্রত্যাহার ও গণভোটের আয়োজনের কথা বলা হয়। ভারত প্রথমে সৈন্য প্রত্যাহার করতে রাজি হলেও গণভোট আয়োজনে অসম্মত হয়। ভারতের ধারণা ছিল, মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরে গণভোট দিলে তারা পাকিস্তানের পক্ষেই যোগ দেবে। অন্যদিকে পাকিস্তানও কাশ্মীর থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে রাজি হয় না। ফলে উভয় দেশেই তথন থেকে কাশ্মীরে সৈন্য মোতায়েন করে রেখেছে।

পরবর্তী সময়ে কাশ্মীর নিয়েই ১৯৬৫ সালে এবং ১৯৯৯ সালে দুই দেশের মধ্যে আবারও যুদ্ধ হয়।

ভারত কী চায়

১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর ভারতের সংবিধানে ৩৭০ ধারা সংযোজিত হয়। ওই ধারা অনুসারে প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার কাশ্মীরে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। একই সঙ্গে কাশ্মীরে নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের কোনো ভূমিকা থাকবে না।

এ ছাড়া রাজ্যের স্থায়ী অধিবাসী ছাড়া সেখানে জমি ক্রয়, রাজ্যের চাকরিতে আবেদন ইত্যাদিও নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি জম্মু-কাশ্মীরের কোনো নারী রাজ্যের বাইরে কাউকে বিয়ে করলে তিনি সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন।

কাশ্মীরবাসীর প্রতি ভারতের সংবিধান যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নানা অজুহাতে ধীরে ধীরে সেসব রহিত হতে থাকে। ১৯৯০ সাল থেকে ভারতের সেনাসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী কাশ্মীরিদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে আসছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বা ড়াবাড়ি ফলে ১৯৯৮ সালে সেখানে সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্ম হয়। এ বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী আরো কঠোর অবস্থানে যায়। ফলশ্রুতিতে আরো অশান্ত হয়ে ওঠে কাশ্মীর উপত্যকা।

যদিও বলা হয়ে থাকে, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস বরাবরই ৩৭০ ধারা মেনে চলার ক্ষেত্রে তুলনামূলক নমনীয়তা দেখিয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন বিজেপি বিগত নির্বাচনের সময়ই ঘোষণা করেছিল, তারা ক্ষমতায় গেলে ৩৭০ ধারা বাতিল করা হবে। মূলত সোমবার দেশটির রাষ্ট্রপতি বিশেষ আদেশের মাধ্যমে বিজেপির সেই পরিকল্পনাই বাস্তবে রূপ দিলেন।


আরো পড়ুন -  কী রয়েছে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারায়?


এ বিষয়ে কাশ্মীরের কংগ্রেস নেতা গুলাম নবী আজাদ সাংবাদিকদের বলেছেন, “বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ৩৫ (ক) ধারারাও বিলোপ করে দেওয়া হলো। এর মধ্য দিয়ে সরকার জম্মু-কাশ্মীরের জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল। এর পরিণাম ভালো হতে পারে না।”

কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থান

১৯৪৭ সাল থেকেই পাকিস্তান মনে করে কাশ্মীর তাদের অংশ হওয়া উচিত এবং এ কারণেই ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের পশতুনরা কাশ্মীর দখলের চেষ্টা চালায়। কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের নীতি বুঝতে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর জাতিসংঘে দেওয়া এক ভাষণই যথেষ্ঠ।

প্রায় ৪২ বছর আগে জুলফিকার আলী ভুট্টো জাতিসংঘে বলেছিলেন, “কাশ্মীর কখনোই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ নয়, বরং এটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার এক বিতর্কিত ভূখন্ড। আর কাশ্মীরের ওপর পাকিস্তানের দাবি সব সময়ই অনেক বেশি। কারণ রক্তে, মাংসে, জীবনযাপনে, সংস্কৃতিতে কিংবা ভূগোল আর ইতিহাসে তারা পাকিস্তানের মানুষের অনেক কাছের।”

ভুট্টোর এই ঘোষণার পর বহু বছর চলে গেছে, দেশটিতে এসেছে বহু শাসক, কিন্তু পাকিস্তানের ওই নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।

কী চান কাশ্মীরের মানুষ

৩৭০ ধারা বাতিলের এই সিদ্ধান্তের পরিণাম কী হবে, এখনই তা বোঝা যাচ্ছে না। কারণ, গোটা উপত্যকায় জারি করা হয়েছে কারফিউ, এই মুহূর্তে থমথমে সব কিছু।

এর আগে ৩৭০ ধারা বাতিল হতে পারে এমন জল্পনায় রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি কেন্দ্রীয় সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা নষ্ট করে দেওয়া হলে তা দেশের পক্ষে অমঙ্গলজনক হবে।

About

Popular Links