সকালে ঘুম থেকে উঠেই মেজাজ খারাপ। অফিসে সহকর্মীর সামান্য কথাতেও বিরক্তি, বাসায় ফিরে পরিবারের কারও অনুরোধও ভালো লাগছে না। এমনকি স্বাভাবিক সময়ে যে বিষয়গুলো সহজেই সামলে নেওয়া যায়, সেগুলোও ইদানীং অসহ্য মনে হচ্ছে। কখনো নিজের অজান্তেই কাছের মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে ফেলছেন। পরে হয়তো নিজের আচরণ নিয়েও খারাপ লাগছে।
যদি এমনটা প্রায়ই ঘটতে থাকে, তাহলে শুধু ‘মেজাজ খারাপ’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। খিটখিটে মেজাজের পেছনে অনেক সময় আমাদের প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস ও জীবনযাপনের ধরন ভূমিকা রাখতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া থেকে শুরু করে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ - বিভিন্ন কারণেই মানুষ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বিরক্ত বা অস্থির হয়ে উঠতে পারেন।
চলুন জেনে নেওয়া যাক এর পেছনের কারণগুলো -
পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া
দিনভর কাজের পর শরীর ও মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুম। কিন্তু নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শুধু শরীরই ক্লান্ত হয় না, মেজাজ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণেও প্রভাব পড়তে পারে। ঘুমের ঘাটতির কারণে দিনের বেলায় ক্লান্তি, মনোযোগের সমস্যা ও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। ফলে সামান্য কোনো ঘটনা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বিরক্তিকর মনে হতে পারে। শুধু ঘুমের সময় কম হওয়াই নয়, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা ঘুমের মান খারাপ হলেও পরদিন মেজাজ খারাপ থাকতে পারে।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ
কাজের চাপ, আর্থিক দুশ্চিন্তা, পারিবারিক সমস্যা, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা নানা দায়িত্ব - জীবনে নানা কারণেই মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। সমস্যা হলো, এই চাপ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে মস্তিষ্ক সব সময় এক ধরনের উত্তেজনার মধ্যে থাকতে পারে। ফলে তার প্রভাব আমাদের দৈনন্দিন আচরণেও প্রতিফলিত হয়।
মানসিক চাপ বাড়লে ছোটখাটো সমস্যাকেও অনেক বড় বলে মনে হতে পারে। ফলে আগে যে বিষয়গুলো সহজে সামলে নেওয়া যেত, সেগুলোতেও বিরক্তি বা রাগ তৈরি হতে পারে।
অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম
ঘুম থেকে উঠেই ফোন দেখা, দিনের বড় একটা সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা, বারবার নোটিফিকেশন দেখা - অনেকের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ হয়ে গেছে এই বিষয়গুলো। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ফোনের নোটিফিকেশন, কাজের বার্তা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা আপডেট। ফলে মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে।
সময়মতো খাবার না খাওয়া
ব্যস্ততার কারণে অনেকেই সকালের নাশতা বাদ দেন, আবার কেউ দুপুরের খাবার খেতে দেরি করেন। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে ক্ষুধার সঙ্গে ক্লান্তি ও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রভাব মেজাজেও পড়ে। তাই ব্যস্ততার মধ্যেও নিয়মিত খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা জরুরি। শুধু পেট ভরানো নয়, প্রতিদিনের খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
শরীরচর্চার অভাব
সারাদিন ডেস্কে বসে কাজ করা, হাঁটাচলা কমে যাওয়া কিংবা কোনো ধরনের শারীরিক কার্যকলাপ না থাকলেও শরীর ও মন দুটিই প্রভাবিত হতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম মেজাজ ভালো রাখতে এবং মানসিক চাপ সামলাতে সহায়তা করে। এজন্য প্রতিদিন আলাদা করে জিমে যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার করা কিংবা পছন্দের কোনো শারীরিক কার্যক্রমে কিছুটা সময় দেওয়া যেতে পারে।
নিজেকে সময় না দেওয়া
কাজ, পরিবার, অন্যের প্রয়োজন এবং সারাক্ষণ ফোনে যুক্ত থাকার কারণে অনেকেরই নিজের জন্য আলাদা সময় থাকে না। দিনের পর দিন একটানা ব্যস্ততার মধ্যে থাকলে মানসিকভাবে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ কমে যায়। দিনের মধ্যে কিছু সময় নিজের মতো করে কাটানো তাই গুরুত্বপূর্ণ। বই পড়া, গান শোনা, হাঁটতে বের হওয়া, প্রিয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা কিছুক্ষণ ফোন থেকে দূরে থাকা - যে কাজটি আপনাকে স্বস্তি দেয়, তার জন্য সময় রাখা যেতে পারে।
কীভাবে খিটখিটে মেজাজ সামলাবেন?
মেজাজ খারাপ হওয়ার কারণ খুঁজে বের করাই প্রথম কাজ। গত কয়েক দিনের ঘুম, খাবার, কাজের চাপ ও স্ক্রিন ব্যবহারের দিকে একটু নজর দিলেই অনেক সময় পরিবর্তনের জায়গাগুলো বোঝা যায়।
নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস করা, সময়মতো খাবার খাওয়া, দিনের মধ্যে ছোট বিরতি নেওয়া এবং শরীরকে সক্রিয় রাখা যেতে পারে। একইসঙ্গে অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করা বা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে ফোন থেকে দূরে থাকার অভ্যাসও কাজে আসতে পারে।
সবকিছু একসঙ্গে পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। বরং যে অভ্যাসটি সবচেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি করছে, সেটি দিয়ে শুরু করাই সহজ।
কখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন?
মাঝেমধ্যে বিরক্ত বা রাগান্বিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু খিটখিটে মেজাজ যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে এবং তা দৈনন্দিন জীবনে স্পষ্ট প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
যেমন - প্রায় প্রতিদিন বিরক্তি অনুভব করা, সামান্য বিষয়েও অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানো, পরিবারের সদস্য বা সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে থাকা কিংবা কাজে মনোযোগ দিতে সমস্যা হওয়া - এসব পরিবর্তন লক্ষ করা জরুরি।
এছাড়া আগে ভালো লাগতো এমন কাজেও আগ্রহ কমে গেলে বা মেজাজের পরিবর্তনের সঙ্গে অন্য কোনো শারীরিক বা মানসিক উপসর্গ দেখা দিলে সেটিও অবহেলা করা উচিত নয়।
প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
খিটখিটে মেজাজকে সব সময় শুধু ‘স্বভাব’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। জীবনযাপনের কিছু পরিবর্তনের পরও যদি সমস্যা থেকে যায়, কিংবা তা কাজ, সম্পর্ক ও দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে, তাহলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
কারণ, দীর্ঘদিনের বিরক্তি বা মেজাজের পরিবর্তনে কখনো কখনো অন্য কোনো শারীরিক বা মানসিক কারণও থাকতে পারে। নিজের আচরণকে দোষারোপ না করে বরং কারণটি বোঝার চেষ্টা করাই হতে পারে আপনার প্রথম পদক্ষেপ।



