Saturday, May 25, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

আজ টিপ, কাল হয়ত শাড়ি

টিপ থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা পর্যন্ত, মৌলবাদীরা এমন একটি আবহ সৃষ্টি করেছে, যা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির মূলধারাকে বিষিয়ে তুলছে

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২২, ০৮:২৫ পিএম

বিষয়টি আনুষ্ঠানিক। আমরা হয়তো যুদ্ধে জিতে যেতাম, কিন্তু রাজাকাররা সেই জয় ছিনিয়ে নিয়েছে।

নিজের চারপাশে তাকিয়ে দেখুন। আজ কপালের একটি “টিপ” একজন পুলিশ সদস্যকে ক্রোধান্বিত করেছে। আগামীকাল মৌলবাদীদের ক্রোধের বস্তু হবে শাড়ি।

বছরের পর বছর ধরে, সবাই বাংলাদেশে মৌলবাদী সমস্যা সম্পর্কে সতর্ক করে আসছেন। ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান থেকে ২০১৩ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোকে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে “বিচ্ছিন্ন ঘটনা” বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ২০১৫ সালে অনেক বাংলাদেশি আইএসআইএস-এ যোগ দিতে যাওয়ার পরও।

এখন সেই বিষ ঢুকেছে পুলিশ বাহিনীতেও।

আজ যখন একজন পুলিশ কনস্টেবল নাজমুল তারেক জানেন না, নৈতিকভাবে পুলিশ বা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে আক্রমণ করা তার কাজ নয়, তাহলে আমরা কাকে দোষ দেবো? শিক্ষা ব্যবস্থা? প্রশিক্ষণ কর্মসূচি? সামগ্রিকভাবে সমাজ? কীভাবেই বা আমরা এই পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব থেকে তাদের বের করে আনার কাজ শুরু করব?

যখন নারীদের প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে বলে দেওয়া হয় তারা কী করতে পারবেন আর কী পারবেন না? তারা কী পরতে পারবেন অথবা পারবেন না? তখন করণীয় কী?

যখন কপালে লাগানো একটি সামান্য সজ্জার বস্তু একজন পুলিশ সদস্যকে ক্ষুব্ধ করে তোলে, এটি যেমন একটি দেশের মানবতার জন্য বড় অপমান তেমনি এটি নিয়মিতভাবে বিশ্বের দুর্নীতি সূচকে শীর্ষে থাকা দেশটির মূল্যবোধকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে নিঃসন্দেহে।

কেন তিনি ছোট্ট একটি টিপ পরার জন্য কারও ওপর এভাবে রাগান্বিত হয়ে আক্রমণ করেছিলেন?

সাংস্কৃতিক যুদ্ধ

১৯৭১ সালে যুদ্ধের পর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলো অনেকটা আমেরিকান কনফেডারেটদের মতো সাংস্কৃতিক যুদ্ধের একটি পদ্ধতিগত প্রচারণা শুরু করে।

৮০-র দশকের গোড়ার দিক থেকে, পরপর সামরিক স্বৈরশাসকরা তাদের শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য মৌলবাদীদের সঙ্গে আঁতাত করে। আর এই কফিনের পেরেক ছিলেন এরশাদ, যিনি আমাদের একটি রাষ্ট্রধর্ম দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক হাজার অভিবাসী শ্রমিক পাঠাতে শুরু করেছিলেন। ফলস্বরূপ, এই অভিবাসীরা কেবল বিস্কুট এবং কুকিজের ব্যাগই নয়, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে ধর্মীয় উত্তেজনাও।

আর, এভাবে আমরা ধীরে ধীরে ঐতিহ্যবাহী সুফিবাদ থেকে দূরে সরে ওয়াহাবি মতবাদের দিকে যেতে লাগলাম।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মানুষ মনে করে শিক্ষিত, স্বাধীন নারীরা হয়রানির যোগ্য। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৫৩% মানুষ মনে করেন ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানির শিকার নারীরাই এই সহিংসতার জন্য দায়ী।

গবেষকরা মনে করেন, ধর্মীয় চরমপন্থা ও উগ্রপন্থী প্রচারণা দৈন্যতা এবং যৌনতা বাড়ায়, যা নারীর প্রতি সহিংসতার মূল কারণ ও প্রগতিশীল নারীদেরকে “খারাপ” হিসেবে চিহ্নিত করে।

“আমি সম্প্রতি ইরাক থেকে ঢাকায় আসা এক মার্কিন নাগরিকের সঙ্গে কথোপকথনে জড়িয়েছিলাম যেটি আমি কখনই ভুলব না। তিনি বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আমরা আবার বাগদাদে ফিরে এসেছি। নারীরা সবাই বোরকা পরা, বিমানবন্দরে আরবি চিহ্ন রয়েছে এবং পুরুষরাও তাদের মতোই পোশাক পরা। আমাকে বলা হয়েছিল বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ কিন্তু এটি দেখতে ঠিক ইরাকের মতো।”

বাংলাদেশ সবসময় এমন অবস্থায় ছিল না। আমরা যদি ১৯৫০ থেকে ১৯৯০-এর দশকের বাংলাদেশের যে কোনো ছবি দেখি, দেখতে পাবো রঙিন চুড়ি, হাতা-কাটা ব্লাউজে সজ্জিত নারীরা। তাদের কপালজুড়ে রঙবেরঙের টিপ।

ধর্ম নির্বিশেষে সকল নারীই একইভাবে পোশাক পরতেন। গ্রামে-গঞ্জে অনেকেই শাড়ি পরতেন কিন্তু ব্লাউজ পরতেন না। এর কোনো নৈতিক “পুলিশিং” ছিল না, ছিল না কোনো কথিত লজ্জা। তাহলে দেশভাগ, ১৯৭১ আর ২০২২-এর মধ্যে কী এমন হয়ে গেল?

দেশভাগের সঙ্গে শুরু হওয়া একটি নতুন সাংস্কৃতিক যুদ্ধ যার ভিত্তি মূলত ধর্ম আমাদের জাতীয় পরিচয় তৈরি করতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে অনেক প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ হয়েছিল ঠিকই কিন্তু গ্রহণযোগ্যতাও ছিল প্রচুর। এরাই সেই রাজাকারেরা যারা ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সহযোগী হয়ে উঠেছিল।

তারা পরিকল্পিতভাবে এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্য বানিয়েছিল যারা টিপ পরতেন, একে একটি “হিন্দু” প্রতীক এবং শাড়িকেও “হিন্দু” পোশাক বলতেন। যারা তখন সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সমর্থন করেছিল এবং ধর্মকে তাদের একমাত্র জাতীয় পরিচয় বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল তাদেরই হত্যার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।

কথাগুলো পরিচিত শোনাচ্ছে?

আমরা আজ সেই একই জিনিস শুনছি শুধু এবারের কথাগুলো সুন্দরভাবে ইউটিউব খুতবা, ফেসবুক ক্লিপ এবং আশেপাশের ওয়াজ মাহফিল রূপে মোড়কজাত করা।

আজকের এই বাংলাদেশে তাদের সাহস হয় জাতির পিতার ভাস্কর্য থেকে আঙুল ভেঙে ফেলার। ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সেই মানুষটিকে আক্রমণ করার, যিনি আমাদের একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ উপহার দিয়েছিলেন।

আমাদের বাকিদের জন্য আর কী কোনো আশা আছে?

যে দেশ সবার ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সম্মান করার দাবি করে, সে দেশ কেন তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সম্মান করতে পারে না? সেই পরিচয়টি যেভাবে বা যে আকারেই হোক প্রকাশ করা সবার ব্যক্তিগত অধিকার নয় কি? সেটা শর্টস, শাড়ি, টিপ বা হিজাব হতে পারে। কেন স্কুলের শিশুরা এমন একজন শিক্ষককে ফাঁসি দিতে বলছে যিনি বলছেন ধর্ম ও বিজ্ঞান আলাদা? হিজাব না পরার জন্য কেন নারীদের ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়?

যদি এই প্রশ্নের উত্তর আপনাকে আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি এখন যেমন সেই ভঙ্গুর পথের দিকে না নিয়ে যায়, আমি তাহলে জানতে চাই আপনি কোন বোকার স্বর্গে আছেন?


এশা অরোরা ঢাকা ট্রিবিউনের বিজনেস এডিটর



About

Popular Links