Saturday, June 15, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডিজিটাল সমাধান

ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য ড. বিওন লম্বোগের লেখা এই বিশেষ নিবন্ধে দেখানো হয়েছে, ই-প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়া সরকারের অর্থ অপচয় রোধ ও দুর্নীতি হ্রাসে কতোটা সহায়ক

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২৩, ১১:২৯ এএম

ভয়াবহ বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর মধ্যে দুর্নীতি অন্যতম। দুর্নীতির কারণে বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্বের সকল মানুষের ক্ষেত্রে মাথাপিছু এই ক্ষতির পরিমাণ ১২০ ডলার।

বিশ্বনেতারা দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি দমন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন, যদিও সেটির বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তবে, সাম্প্রতিক গবেষণায় দুর্নীতি কমানোর একটি সহজ উপায় চিহ্নিত করা গেছে। যার ফলে ভুক্তভোগী দেশগুলোর কয়েক মিলিয়ন বা বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি ঠেকানো সম্ভব।

দ্রুত এবং কার্যকরী সেবা পাওয়ার জন্য ঘুষখোর কর্মকর্তারা গ্রাহকদের কাছে বেশ গ্রহণযোগ্য, যা দুর্নীতি প্রতিরোধের অন্যতম অন্তরায়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজির) অংশ হিসেবে ২০১৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে দুর্নীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাজনীতিবিদরা, বিশ্বের সকল দেশের সরকারও এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করেছেন।

দুর্ভাগ্যবশত, রাজনীতিবিদরা এ বিষয়টি নিয়ে এখনও তেমন সোচ্চার না।ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি সূচকে দেখা গেছে, বৈশ্বিক পর্যায়ে গত এক দশকে দুর্নীতি নির্মুলে শূন্য অগ্রগতি হয়েছে।সূচক অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্ব ততোটাই দুর্নীতিগ্রস্ত, যেমনটা ২০১২ সালেও ছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, ২০৩০ সাল তো নয়ই; নিকট ভবিষ্যতেও দুর্নীতি থেকে পরিত্রাণের কোনো  সম্ভাবনা নেই।

তবে, যেসব  বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে আমরা পিছিয়ে আছি তার মধ্যে দুর্নীতি হ্রাসই একমাত্র নয়। প্রকৃতপক্ষে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের এসডিজির শতাধিক প্রতিশ্রুতির প্রায় সবগুলোতেই ব্যর্থ আমরা। বর্তমান অগ্রগতি অনুযায়ী, এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিশ্রুত এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক সময় পার হয়ে গেলেও অর্জনের অর্ধেকের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারিনি আমরা। তাই, এসব ক্ষেত্রে আরও ভালো করার ব্যাপারে এখনই আলোচনা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণেই আমাদের কোপেনহেগেন কনসেনসাসের গবেষকরা এসডিজি'তে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি করা যেতে পারে এমন ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে বিগত কয়েক বছর ধরে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। সবচেয়ে ভালো ফল পেতে আমাদের প্রথমে সবচেয়ে স্মার্ট নীতিগুলো গ্রহণ করা উচিত। দুর্নীতির ওপর আমাদের নতুন গবেষণায় দেখানো হয়েছে, এ সমস্যা হ্রাস করতে ক্রয়নীতি উন্নত করা ভুক্তভোগী দেশগুলোর শীর্ষ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই বেসরকারি খাত থেকে পণ্য ও সেবার বৃহত্তম ক্রেতা সে দেশের সরকার। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট খাতে বৈশ্বিক বার্ষিক ব্যয় ১৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বৈশ্বিক জিডিপির ১৫%। যেসব দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি, সেসব দেশের সরকারি ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক খরচ হয় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট খাতে। 

এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে অনলাইনে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আরও বেশি স্বচ্ছ, কার্যকর এবং কম দুর্নীতিগ্রস্ত  করা যেতে পারে। ইলেক্ট্রনিক প্রকিউরমেন্ট বা "ই-প্রকিউরমেন্ট" অনেক বেশি কোম্পানিকে দরপ্রত্র সম্পর্কে জানতে এবং দরপ্রত্র জমা দিতে উৎসাহিত করে। এর ফলে দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারে যে অর্থের অপচয় হয়, তার পরিমাণ কমবে।

বাংলাদেশে ২০১১ সালে  ই-প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম চালু হয়েছে। তবে, বিশ্বের প্রতি দশটি নিম্ন এবং নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে এখনও এই ব্যবস্থা অনুপস্থিত। আমাদের গবেষকরা বাংলাদেশ ও রুয়ান্ডার মতো নিম্ন-আয়ের দেশ, ইউক্রেন ও তিউনিসিয়ার মতো মধ্যম-আয়ের দেশ এবং ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উচ্চ-আয়ের দেশগুলোতে ই-প্রকিউরমেন্ট উদ্যোগের খরচ এবং এর প্রভাব পর্যালোচনা করেছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ই-প্রকিউরমেন্ট সিস্টেমের পরিকল্পনা করতে গড়ে এক বছর সময় লাগে, এটির নকশা ও নির্মাণে আরও দেড় বছর এবং পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু করতে আড়াই বছর সময় লেগে যায়। এক্ষেত্রে প্রথম ১২ বছরে গড় বার্ষিক খরচ ১৬.৭ মিলিয়ন ডলার। যা অধিকাংশ দেশের বার্ষিক বাজেটের তুলনায় খুবই ছোট অংক।

ই-প্রকিউরমেন্ট সিস্টেমের অনেক সুবিধা রয়েছে। একটি পরিকল্পিত ই-প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম কার্যকরী নজরদারি নিশ্চিতের পাশাপাশি এবং দুর্নীতি শনাক্তকরণে সহায়ক। এর ফলে কর্তৃপক্ষ সহজে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে।ই-প্রকিউরমেন্ট দরদাতার সংখ্যা বাড়ায়। ভারতের কর্নাটক রাজ্যে ই-প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম চালু হওয়ার পর প্রথম তিন বছরে সরকারি দরপত্রে দরদাতার সংখ্যা ১২০ থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৮০০ জনে দাঁড়িয়েছে। ই-প্রকিউরমেন্ট সিস্টেমের ফলে দরপত্রের জন্য সরকারের বিজ্ঞাপন খরচ কমে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে ফিলিপাইন সরকার শুধুমাত্র সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন ব্যয় থেকেই বার্ষিক ৯ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছে।

ই-প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম ক্রয় প্রক্রিয়ার গতি বাড়ায়। এই সিস্টেমের ফলে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতিটি দরপত্রের পেছনে ব্যয়িত সময় ৩০ ঘণ্টা থেকে কমে ২ ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে, আর্জেন্টিনায় এই প্রক্রিয়ায় সময় ১১ দিনের বেশি কমে গেছে।এটি অস্বীকার করা যাবে না যে, কোনো কাজ দ্রুত করা মানেই সুনিপুণ নয়। কিন্তু এটি প্রমাণিত যে, ক্রয় প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড করলে এটি তদারকি সহজ হয় এবং তুলনামুলক ভালো ফল পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে ই-প্রকিউরমেন্ট সিস্টেমে চালু হওযার পর দেশটির সড়কের গুণমান ১২% বৃদ্ধি পেয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ই-প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম সরকারি  সামগ্রিক ব্যয় হ্রাস করে।আমাদের গবেষণায় দেখানো হয়েছে, এই সিস্টেমের ফলে ব্যয় ৬.৭৫% কমে; বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে যা  সরকারের বড় অংক সাশ্রয় করে। নিম্ন-আয়ের দেশের ক্ষেত্রে প্রথম  ১২ বছরে এই সঞ্চয়ের পরিমাণ ৬০০ মিলিয়নেরও বেশি। অর্থাৎ, নিম্ন-আয়ের দেশে সরকারের ব্যয় করা প্রতি ডলারের বিপরীতে এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ৩৮ ডলার। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোয়  প্রথম  ১২ বছরে এই সঞ্চয়ের পরিমাণ ৫ বিলিয়নেরও বেশি, যেখানে প্রতি ডলারের বিপরীতে সামাজিক প্রবৃদ্ধি ৩০০ ডলারের বেশি। এখান থেকে সহজে অনুমেয় যে, ই-প্রকিউরমেন্টকে বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর নীতিগুলির মধ্যে একটি।

দুর্নীতি সম্পূর্ণরুপে নির্মুল করার মতো কোনো জাদুর কাঠি আমাদের হাতে নেই। তবে, ই-প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম দুর্নীতির পরিমাণ কমায় এবং সমাজের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনে; সেটি ইতোমধ্যেই প্রমাণিত।


ড. বিওন লম্বোগ কোপেনহেগেন কনসেনসাসের প্রেসিডেন্ট এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির হুভার ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো।


এই নিবন্ধ ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. বিওন লম্বোগের লেখা বিশেষ সিরিজের পঞ্চম অংশ। সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন যথাক্রমে-

- বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজন দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব

-  এসডিজি বাস্তবায়নে যে ভুলগুলো করেছে বিশ্ব

শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমলে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে

-টিকাদানে আগ্রহী হওয়া উচিত যেসব কারণে

About

Popular Links