Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কী হবে, কী হতে পারে?

রাজনীতিবীদের কারণেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্বাচনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে প্রতিবার ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। একে বলা যেতে পারে মৌসুমি আন্দোলন

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:২৬ পিএম

দেশের মানুষ শান্তি চায়। স্থিতিশীল পরিস্থিতি চায়। অর্থনৈতিক মুক্তি চায়। রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা চায়। সার্বিক উন্নয়ন চায়। প্রতিবার জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলে রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিরীহ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়। লাশ নিয়ে রাজনীতি আগেও হয়েছে, এখনো চলছে। হয়ত ভবিষ্যতেও চলবে। আসছে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে কয়েকজনের প্রাণহানি হয়েছে। 

আগামী দিনগুলোতে এই সংখ্যা হয়ত আরও বাড়তে পারে। এভাবে আর কতদিন চলবে বাংলাদেশের রাজনীতি? আর কতজনকে দিতে হবে প্রাণ? এসব প্রাণের বিনিময়ে লাভবান হচ্ছে কারা? বাংলাদেশের মানুষ এধরণের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন চায়, মুক্তি চায়।

যারা অকাতরে প্রাণ দেয়, গুরুতর আহত হয়ে বাকি সময় পঙ্গু জীবন কাটায়, যাদের নানা কারণে নির্যাতিত হয়ে ঘর বাড়ি পরিবার ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়, কে রাখে তাদের পরিবারের খবর? পেছনে না তাকিয়ে আমরা যদি শুধুমাত্র বিগত জাতীয় নির্বাচনগুলোর পূর্ব মুহূর্তের সেই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির কথা চিন্তা করি তাহলে আতংকিত হই। আবারও কি আসবে সেই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি? অন্যদিকে যেসব রাজনৈতিক নেতার কারণে আজ দেশের এই অবস্থার সৃষ্টি তাদের সন্তানরা কিন্তু কোনো দিন বন্দুকের গুলিতে মরে না। এদের অনেকেরই সন্তান বাস করে বিদেশ। রাজনীতির নামে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে এই মৃত্যু মৃত্যু খেলা আর কতদিন চলবে?

দেশ ও দেশের মানুষ আজ রাজনৈতিক দলের সমর্থক, কর্মী ও নেতা-নেত্রীদের হাতে বন্দি। সংখ্যায় এরা বেশি না হলেও শক্তি ও ক্ষমতায় তারা অসীম। এসব রাজনীতিবীদের কারণেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্বাচনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে প্রতিবার ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। একে বলা যেতে পারে মৌসুমি আন্দোলন। 

কী হবে, কী হতে পারে আগামী দিনগুলোতে। কেউ কেউ বলছেন খুব শিগগিরই একটা কিছু হতে পারে। বিশ্বের ক্ষমতাসীন দেশগুলো তাদের উদ্ধার করবে। তাই সরকার বিরোধী রাজনৈতিক জোট নির্বাচন বর্জন করে ক্ষমতাশীল দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। শুধু আশায় আশায় আছে যদি তারা কিছু করে। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষভাবে জড়িত হওয়াকে অনেকেই ভালোভাবে না দেখলেও বিরোধী জোট দেখছে ইতিবাচক। বিশ্ব রাজনীতি বার বার প্রমাণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কোনদিকে। বিরোধী জোটের এই নির্বাচন বর্জন সম্ভবত এই কারণেই পূর্বের মতো ততটা প্রভাব নাও ফেলতে পারে।

কারণ শুধুমাত্র এককভাবে দলীয় সমর্থন কোন আন্দোলনকে জোরদার করতে পারে না। সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সংগ্রাম সফল হতে পারে না। বাংলাদেশসহ বিশ্ব রাজনীতিতে তার অনেক প্রমাণ আছে। এছাড়া এবারের নির্বাচনে অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সরকারবিরোধী জোট থেকে বের হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করছেন। ফলে নির্বাচনী পরিবেশ ২০১৮ মতো না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সুতরাং কী হবে, কী হতে পারে এই চিন্তার কোনো বাস্তবতা নেই। এসব গুজব শুধু মানুষের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করা ছাড়া আর কিছুই করবে না।

তবে সব কিছুই নির্ভর করবে নির্বাচনের নিরপেক্ষতার ওপর। কারণ নির্বাচন কমিশন যদি নিরপেক্ষতা প্রমাণে ব্যর্থ হলে এই নির্বাচনী ফলাফল শুধু মাত্র বাংলাদেশেই নয় বিদেশেও গ্রহণযোগ্য হবে না। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহনের ওপর। কারণ, বাংলাদেশের নির্বাচনে এখন অনেকেরই দৃষ্টি। 

নির্বাচন কমিশনকে এখন সুষ্ঠু সুশৃঙ্খল অবাধ ও একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন জনগণকে উপহার দিতে হবে। ২০১৮ নির্বাচনের মতো অবস্থা সৃষ্টি হলে এবার আর বিশ্ব গ্রহণ করবে না বলেই অনেকে মনে করছেন। অন্যদিকে ৭ জানুয়ারির নির্বাচন যদি জনগণের অবাধ অংশগ্রহনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন করতে সফল হয় তাহলে তা হবে নির্বাচন বর্জনকারী জোটের জন্য এক বিরাট পরাজয়। এক বিরাট ব্যর্থতা।

এই অবস্থায় জনগণের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টির জন্য বর্জনকারী জোট  আবারও সেই আগের মতো জ্বালাও-পোড়াও-বোমাবাজি শুরু করলে ফলাফল যাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের পক্ষে। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ভারত, রাশিয়া, চীন এবং ইইউসহ বড় আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো বোঝাতে সক্ষম হবে এরা সন্ত্রাসী। বিশ্ব তখন নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে বাধ্য হবে। 

বড় বড় দেশগুলো তখন নির্বাচন নিয়ে কোন নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে না। বরং নির্বাচনের ফলাফলকে সমর্থন জানাবে। বল এখন নির্বাচন বর্জনকারী জোট ও দলের কোর্টে। সঠিক ট্র্যাক থেকে বিচ্যুত হয়ে যদি তারা ধ্বংসের পথ বেছে নেয় তাহলে জনগণ ও বিশ্ব রাজনীতি থেকে তারা সমর্থন হারাবে। সন্ত্রাসী দল হিসেবে পরিচিতি লাভের সম্ভবনা সৃষ্টি হবে। জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে। 

আসছে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একটি নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে। নিজের দলে যারা নৌকা প্রতিক থেকে বঞ্চিত তারা এবার চাইলে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে  স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ লাভ করেছে। ফলে অনেকে মনে করছেন নিজেদের মধ্যে লড়াই করতে গিয়ে নির্বাচনী ফলাফলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের কিছুটা হলেও আসন হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। 

সঠিক নির্বাচন হলে আওয়ামীপন্থী প্রার্থীদের ভোট ভাগাভাগিতে মাঝখান দিয়ে ভিন্ন প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভবনার কথা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নির্বাচনের এই ভিন্ন প্রতিযোগিতায় ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণ স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছে যা নির্বাচনী পরিবেশকে করবে ইতিবাচক। সেই সাথে আসন হারালেও আওয়ামী লীগ ও সমভাবাপন্ন প্রার্থীরা পাবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ। সমালোচকেরা বলছেন, আওয়ামী লীগের এই কৌশল পুনরায় তাদের ক্ষমতায় বসার সুযোগ সৃষ্টি করবে বৈকি।

নির্বাচন বয়কটকারী জোট নির্বাচনের বাহিরে থেকে নির্বাচন বিরোধী আন্দোলন করে কতটুকু সফল হবে তার নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন। কারণ দীর্ঘ সময় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার মতো শক্তি ও ঐক্য এখন আর এই জোটের মধ্যে নেই বললেই চলে। ইতোমধ্যেই অনেকেই এই জোট থেকে বেরিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। নির্বাচন বর্জনকারী জোট এখন এক কঠিন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। আল্টিমেটাম ও হরতাল ডেকে কোনো লাভ হবে না বলেই পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন। কারণ সাধারণ মানুষ এ ধরনের আন্দোলনকে এখন আর সমর্থন করে না।

সম্পদ ধ্বংস, নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ও দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়া নির্বাচন বিরোধী জোট আর কিছুই পাবে না। কারণ আল্টিমেটাম এর আগেও কয়েকবার দেওয়া হয়েছে। এভাবে বার বার তারিখ দিয়ে আল্টিমেটাম ঘোষণা করে কোনো লাভ নেই। আল্টিমেটাম আর হরতালের পথ থেকে সরে এসে বিরোধী জোটের উচিত নির্বাচন বিরোধী শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের চেষ্টা করা। নির্বাচনের বিপক্ষে যদি কিছু করতেই হয় তাহলে তা করবে বাংলাদেশের জনগণ। বিদেশুরা নয়। সুতরাং বিদেশিদের ওপর নির্ভর না করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনই এখন বর্জনকারী জোটের সামনে একমাত্র খোলা পথ।

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, সার্ভিস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইউনিয়ন (পোস্ট ) স্টকহোম সাউথ ব্র্যাঞ্চ
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x