নাম সম্রাট, তবে তিনি কোনো সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন না। জন্ম শরীয়তপুরের চিকন্দী ইউনিয়নের এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে। টানাপোড়েন দেখে বেড়ে ওঠা সম্রাট স্বপ্ন দেখতেন, একদিন বড় হবেন। চিকন্দী সরফ আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়ে ২০১৮ সালের অক্টোবরে অনেক স্বপ্ন নিয়ে রাজধানী ঢাকায় পাড়ি জমান।
নিজেই কিছু একটা করার স্বপ্ন নিয়েই তার ঢাকায় আসা। তখন ঢাকায় তার আপন বলতে কেউই নেই। অনলাইন মাধ্যমে কাজ করে যে উপার্জন করা যায়, সে বিষয়ে তার ধারণা ছিল আগে থেকেই। আর তাই এই মাধ্যমেই কাজের সুযোগ খুঁজতে থাকেন সম্রাট।
এর মধ্যেই বিশ্বখ্যাত অনলাইন জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম অ্যামাজনে ই-কমার্স নিয়ে একটি কোম্পানির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তাদের মাধ্যমেই তার প্রথম কাজ পাওয়া শুরু।
এই কাজ করতে গিয়ে হঠাৎই একদিন বড় সমস্যার সম্মুখীন হন সম্রাট, ফলে বাধ্য হয়ে কাজ ছেড়ে দিতে হয়। এরপর বেশ ভেঙে পড়েন তিনি। সেসময় তার থাকা-খাওয়া এবং চলার মতো সঙ্গতি ছিল না।
এরপর প্রতিযোগিতার শহর ঢাকায় টিকে থাকতে অন্য কাজ খুঁজতে থাকেন তিনি। একদিন পরিচিত এক বড় ভাই তাকে একটি রেস্টুরেন্টে কাজের সুযোগ করে দেন। তখন তিনি একটু আশার আলো খুঁজে পান। অন্তত থাকা-খাওয়ার একটা গতি তো হলো!
সম্রাটের ভাষ্য, “একটা কাজের ব্যবস্থা হলেও শুরুটা খুব মসৃণ ছিল না। সেখানে ইন্টারভিউতে আমাকে ফরমাল পোশাক পরে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আমার কাছে সেসব কিছুই ছিল না। এমনকি সেই রেস্টুরেন্টে যাওয়ার ভাড়াটাও ছিল না।”
“ওই মুহূর্তে কাজটি আমার খুব দরকার ছিল। তাই এক আত্মীয়ের কাছ থেকে ৮০০ টাকা ধার নিয়ে নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাত থেকে শার্ট,প্যান্ট ও জুতা কিনি। সেগুলো পরে ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। সাত হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করি। প্রতিদিন প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় দিতে হতো।”
অনেকের উপহাস সইতে হয়েছে জানিয়ে সম্রাট বলেন, “জামা-কাপড়ের জন্য অনেকের হাসি-ঠাট্টার পাত্র হতে হয়েছে। তবুও চুপ করেই থাকতাম, কোনো প্রত্যুত্তর করতাম না।”
পরের গল্পটা আরও কোতুহলোদ্দীপক। তিনি বলেন, “রেস্টুরেন্টে চাকরিরত অবস্থায় হঠাৎ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১৫ দিন অসুস্থ ছিলাম। কাজ করতে পারিনি। এক মাসের বেতন পাওনা থাকলেও সেটা আর দেয়নি আমাকে। এরপর প্রায় বেশ কয়েকদিন আমাকে বাইরে বাইরে ঘুরতে হয়েছিল কাজের জন্য।”
এরপর সম্রাট এক পরিচিত বড় ভাইয়ের অফিসে কাজ করতেন। সেখানে অনলাইন মাধ্যমে কাজ করতে হতো। সেখান থেকেই অনলাইনে উপার্জন বিষয়ে বিশদ ধারণা হয় তার। এরপর সেই জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগের চেষ্টা।
ই-কমার্সে পথচলা
একপর্যায়ে এক মার্কিন গ্রাহকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার সঙ্গে কাজ নিয়ে কথা হয়। তখন সেই গ্রাহক তাকে অ্যামাজন আর ওয়ালমার্ট নিয়ে বেশকিছু কাজ দেন। অ্যামাজন স্টোরের যাবতীয় কাজ যেমন- স্টোরের অর্ডার হিসাব, ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট পণ্য বাছাই, খরচ এবং লাভ সব কাজেরই হিসাব করতে হতো রাত জেগে।
সেখান থেকে শুরু সম্রাটের নতুন পথচলা। ই-কমার্স নিয়ে মাঠে নামেন তিনি।
সম্রাট জানান, ই-কমার্সের প্রথম দিকটা খুবেই কষ্টের ছিল। প্রথম মাসে কাজের জন্য মাত্র ১৮ ডলার আয় হয়। দৈনিক ১৬-১৮ ঘণ্টা কাজ করে দুই-তিন মাস এভাবেই চলতে থাকে তার। এ সময়টুকুতে পাশে পরিবারের মানুষ ছাড়া আর কাউকেই পাননি এই তরুণ। এরপর
ধীরে ধীরে বাড়ে দক্ষতা। একপর্যায়ে বাল্যবন্ধু রায়হান তার কাজে সহযোগিতা করতে শুরু করেন এবং তাদের কাজের পরিধি বাড়তে শুরু করে। এরপর তাদের সঙ্গে যুক্ত হন আরও একজন। তিনজনের একটি টিম নিয়েই তাদের ই-কমার্স জগতে পথচলা শুরু হয়।
/সম্রাট মনে করেন তরুণরাই পরিবর্তন আনতে পারে সমাজে
২০১৯ সালের ২০ জুন সম্রাট প্রতিষ্ঠা করে তার নিজস্ব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান “এস আর সলিউশন”। এরপর থেকে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সম্রাটের প্রতিষ্ঠানে এখন কাজ করেন ১৮০ জন কর্মী, যাদের প্রত্যেকেই বাংলাদেশি। সম্রাট তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এই কর্মীরা প্রত্যেকেই ভালো অংকের টাকা আয় করেন। এদের মধ্যে যারা একটু বেশি দক্ষ তারা প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকাও আয় করে থাকেন।
সম্রাট জানান, প্রতি মাসে কর্মীদের বেতন বাবদ তার ব্যয় ৮০-৯০ লাখ টাকা।
ই-কমার্স নিয়ে কাজ করতে তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকারও হয়েছেন ২৩ বছর বয়সী এ তরুণ। তিনি বলেন, “পথচলার শুরু থেকে নানা প্রতিবন্ধকতাই পার করেছি। অনেকের বিশ্বাসঘাতকার শিকারও হয়েছি আবার প্রতারণারও। আমি তাদের নাম বলতে চাই না। তবে এটুকু বলতে পারি, অনেকেই আমার হাত ধরে কাজ শিখে অনেক দূর গিয়েছেন। তাদেরই কেউ কেউ আবার আমার ক্ষতি করতে চেয়েছে। তবুও পিছপা হইনি।”
সম্রাট এখন এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত। তার ইচ্ছা আগামীতে আরও মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন এবং তার কর্মীদের একটা অফিসের আওতায় নিয়ে আসবেন।
এই তরুণ উদ্যোক্তা মনে করেন, যুবকদের কাজে লাগিয়েই দেশ ও দশের কল্যাণ করা সম্ভব।



