ব্যক্তি যখন কোনো দুর্ঘটনা, সহিংসতা, দুর্যোগের শিকার হন, কিংবা মর্মান্তিকভাবে প্রিয় কারো মৃত্যু বা আহত হওয়া দেখেন; তখন সেটি তার মনের ওপর বেশ মারাত্মক রকমের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
অর্থাৎ যেকোনো ধরনের ভীতিকর ও কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতাই মানুষের মনে পরবর্তী সময়ে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। মানসিক স্বাস্থ্যের পরিভাষায় এটিকে বলা হয়, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি।
রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলজে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ও করণীয় বিষয়ে ঢাকা ট্রিবিউন’র সঙ্গে কথা বলেছেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সৃজনী আহমেদ। তিনি ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
ঢাকা ট্রিবিউন: মাইলস্টোনের ঘটনায় কারা পিটিএসডিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে?
ডা. সৃজনী আহমেদ: বড় ধরনের দুর্ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে যারা দুর্ঘটনাস্থলে থেকে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা পান, দুর্ঘটনা কবলিত স্থানে সাহায্যে নিযুক্ত পেশাদার-অপেশাদার সাহায্যকারীগণ, দুর্ঘটনায় যারা পরিবারের/বন্ধুবর্গের কাউকে হারান তাদের মধ্যে পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে বর্তমান সময়ে সরাসরি প্রত্যক্ষের আরেকটা মাধ্যম হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। যেখানে প্রায় বাস্তবতার কাছাকাছি এই অভিজ্ঞতাগুলো বারবার সামনে আসতে পারে৷ টিভি বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দুর্ঘটনাস্থলের পুঙ্খাপুঙ্খ বর্ণনা, এমনকি কিছু অপ্রয়োজনীয় বাড়তি উপাদানের মিশ্রনও কিছু মানুষকে দূর থেকে আক্রান্ত করে। তবে একই দুর্ঘটনায় আক্রান্ত সবাই পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হন না।
ঢাকা ট্রিবিউন: সেক্ষেত্রে পিটিএসডিতে আক্রান্তে ঝুঁকিটা কাদের বেশি?
সৃজনী আহমেদ: সব বয়সী মানুষেরাই পিটিএসডিতে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা সবচেয়ে বেশি৷ আর দুঃখজনকভাবে মাইলস্টোনের ঘটনায় শিশু-কিশোরার সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। আগুনে পোড়া আক্রান্ত শিশু-কিশোরদের শতকরা ৮০ জনই পিটিএসডিতে আক্রান্ত হতে পারেন। এক থেকে দুই বছর পরও তাদের মধ্যে এই উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে আক্রান্তের হার ৩০%। এছাড়া আক্রান্ত যাদের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়, মস্তিষ্কে আঘাতপ্রাপ্তরা, পূর্বেকার কোনো মানসিক রোগ থাকলে, নিকট অতীতে বড় ধরনের চাপের মুখোমুখি থাকলে; এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিত্বের ধরনের কারণে পিটিএসডির ঝুঁকি বেশি থাকে। মাইলস্টোনের ঘটনায় অনেক শিক্ষক, স্কুলের কর্মী এবং অভিভাবকও চরম ঝুঁকিতে আছেন।
ঢাকা ট্রিবিউন: পিটিএসডির উপসর্গ কখন দেখা দিতে পারে?
ডা. সৃজনী আহমেদ: পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের লক্ষণ ঘটনা পরবর্তী এক সপ্তাহ পর থেকেই দেখা দিতে পারে। আবার ৩০ বছর পরেও এর লক্ষন দেখা দিতে পারে।
ঢাকা ট্রিবিউন: কী ধরনের প্রভাব/উপসর্গ দেখা দিতে পারে?
ডা. সৃজনী আহমেদ: স্মৃতির পুনরাবৃত্তি: বার বার স্মৃতিতে দুর্ঘটনার দৃশ্য আসা, দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত যেকোনো বস্তু/শব্দ (জামা, ছবি, সেই তারিখ, স্কুলের ঘণ্টা এরকম সংশ্লিষ্ট যেকোনো কিছু) থেকে স্মৃতির পুনরাবৃত্তি।
এড়িয়ে চলা: যেমন অভিভাবকও স্কুলে পাঠাতে পারছেন না, বাচ্চাও স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে, এমন কী অন্য সন্তানকে পড়তে বসাতেই অভিভাবক ভয় পাচ্ছেন।
দুঃস্বপ্ন দেখা: প্রচণ্ড ভয়- আতংক; ঘুম ভেঙে আতঙ্কগ্রস্ত হওয়া, বারবার কেঁপে কেঁপে ওঠা।
ভুলে যাওয়া: মাঝে মাঝে ভুলে যাওয়া, এমন কী আত্মবিস্মৃত হওয়া (নিজের নাম-ঠিকানা, পরিচয় ভুলে যাওয়া, বাবা-মায়ের তথ্য ভুলে যাওয়া)।
এছাড়া, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে খিটখিটে মেজাজ, বড়দের ক্ষেত্রে তীব্র বিষণ্ণতা, নিদ্রাহীনতা দেখা দিতে পারে।
এসব লক্ষণগুলো দেখা দেওয়ার পর থেকে যদি এক মাসের বেশি স্থায়ী হয় এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যহত হয়; তখন সেটিকে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার বলা হয়।
ঢাকা ট্রিবিউন: নিরাময়ের ক্ষেত্রে করণীয় কী?
ডা. সৃজনী আহমেদ: এরকম দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের জন্য জরুরিভাবেই মানসিক সহায়তা দরকার হয়। এই সহায়তাকে “মানসিক ফার্স্ট এইড” বলে। এক্ষেত্রে করণীয় হলো:
- আক্রান্তদের যত দ্রুত পারা যায় নিরাপদ স্থানে নেওয়া।
- আক্রান্তদের শারীরিক ক্ষত, মস্তিষ্কের ক্ষতর দ্রুত যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা৷ শারীরিক ক্ষত না সারানো গেলে সেটাও মানসিক যন্ত্রণা বাড়িয়ে দেয়। আর মস্তিষ্কে অক্সিজেন স্বল্পতা হলে পরবর্তীতে স্মৃতি বিভ্রম আরও বেশি হয় এবং পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের লক্ষণ সারানোতে বেশ জটিলতা হয়।
- আক্রান্তদের নিকটজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করানো। এক্ষেত্রে এটা খুব জরুরি কারণ অনেক বাচ্চা এই দুর্ঘটনায় আক্রান্ত, তাদের মা-বাবা ও অভিভাবকের সঙ্গে দেখা না হলে তাদের আতংক কাটানো যাবেনা।
- এরকম দুর্ঘটনার পর অনেক রকম আবেগের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়৷ বিশেষ করে প্রচন্ড রাগ, নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন, অস্তিত্ব নিয়ে অসহায়তা এমনটা দেখা যায়৷ সেই আবেগকে উড়িয়ে দেওয়া হলে আরও নেতিবাচক অবস্থা হয়৷ তাই সেটা আমলে নিয়ে সহমর্মিতার সঙ্গে কাজ করতে হয়। (যেমন- একজন কিশোর, যে হয়তো তার ভাই বা বোনকে দেখেছে পুড়ে যেতে, সে অন্য একজনকে উদ্ধার করে এনেছে, অথবা অচেনা একজনের পোড়া দেহ উদ্ধার করেছে।) এমন পরিস্থিতির পর সে যেকোনো সময় হয়তো চিৎকার করে কেঁদে উঠতে পারে বা কাউকে তীব্র দোষারোপ করতে পারে। এক্ষেত্রে তাকে সেটি করতে দিতে হবে। বাধা দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে সাংবাদিক অথবা সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে সেটা বার বার রেকর্ড করা বা সেটি প্রচার করাটা কোনো সহমর্মী আচরণ না। কারো কষ্টের কথাগুলো এই সময় মনোযোগসহকারে শুনে যাওয়াটাও অত্যন্ত প্রয়োজন।
- সহমর্মী/সহানুভূতিশীল নয় এরকম পরিবেশ, ভীড়, অতিরিক্ত আওয়াজ আরও আতংক বাড়িয়ে দেয়৷ এজন্য এ ঘটনায় শিশু, শিক্ষক, স্কুলের কর্মী, অভিভাবক, ফায়ার সার্ভিসের সেবাদানকারী, প্রত্যক্ষদর্শী সবাইকে যতটা পারা যায় অযাচিত ভীড় এবং আওয়াজ থেকে দূরে রাখাও প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশুরা এই সময়ে আওয়াজ হলেই কেঁপে উঠার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। সেই সময় যতটা পারা যায় হট্টগোলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাটা প্রয়োজন।

ঢাকা ট্রিবিউন: পিটিএসডির ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব কতটা?
ডা. সৃজনী আহমেদ: বর্তমান যুগে সামাজিকমাধ্যম আমাদের এতটাই আচ্ছন্ন করে ফেলেছে যে আমরা অনেক কাজই না বুঝে করে অন্যদের মানসিক কষ্ট বাড়িয়ে দিচ্ছি। যেমন- একদম পোড়া শরীর নিয়ে হেঁটে যাওয়া বাচ্চার ছবিটা দেখে অনেক মা-বাবা প্রচণ্ড যাতনায় পড়েছেন। একেতো এত বড় একটা দুর্ঘটনা, এরমধ্যে সবার কাছে এটা খারাপ লাগছে যে বাচ্চাটি ওই তীব্র যন্ত্রনা মূহুর্তে স্রেফ ছবির বিষয়বস্তু হয়ে গেল, কেউ তাকে জড়ানোর চেষ্টা করছে বা কেউ তার হাত ধরছে- এই বিষয়টা থাকলো না। মানবমনের এই অমর্যাদা অনেক কষ্ট হয়ে উঠছে। তাই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিছুদিন এড়িয়ে চলারই পরামর্শ দিচ্ছি আমি অনেক অভিভাবককে।
ঢাকা ট্রিবিউন: অভিভাবক ও স্বজনদের জন্য যদি কিছু বলতে চান।
ডা. সৃজনী আহমেদ: শোকের সবচেয়ে বড় স্বান্তনা কিন্তু নীরবতাও। একজন শিশু তার বয়স ৬-৭ বছর আগে মৃত্যুর ভয়াবহতা বুঝতেও পারে না। আবার অনেক যন্ত্রণাকাতর শিশু বুঝতেও পারছে না কিছুক্ষণ পরে তার মৃত্যু হবে, সেটা কেমন। চিকিৎসার পাশাপাশি তাকে স্বান্তনা দেওয়ার চেষ্টাটাই কিছুটা তার যন্ত্রণার উপশম করতে পারে। কোনো কোনো অভিভাবকের প্রয়োজন হতে পারে তার হাতটা ধরে চুপ করে কেউ তার হারিয়ে যাওয়া সন্তানের স্মৃতিচারণ মন দিয়ে শুনুক। এই সময় সহমর্মিতা খুব প্রয়োজন। অনেক অভিভাবকই এ ঘটনার পর তার সন্তানের সঙ্গে ভালো সময় কাটানো কিংবা দৈনন্দিন কাজের সময় উদ্বিগ্ন কিংবা বিবেকের তাড়নায় ভুগতে পারেন। তবে মানিয়ে নেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটাই মানুষের জীবনের বৈশিষ্ট্য। শিশু কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখুন৷ তাদের বিভিন্ন গল্পের মাধ্যমে, পারিবারিক কার্যক্রমে শোক প্রকাশের সহানুভুতিশীল উপায়গুলো চর্চা করাতে পারেন। নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী প্রার্থনা বজায় রাখুন। কান্না এলে নীরব এবং সুবিধাজনক স্থানে কিছুক্ষণ কান্না করে নিন।



