একজন ফুটবলারের কাছে ফিফা বিশ্বকাপের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর সম্মানজনক আর কিছু নেই। পেশাদার ফুটবলে পা দেওয়ার পর থেকেই তারা স্বপ্ন দেখেন ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করার। জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলা যতটা সম্মানজনক, আর কোনো কিছুরই সেটিকে ছাপিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য নেই।
ফিফা বিশ্বকাপে জাতীয় দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন থাকে প্রতিটি ফুটবলারেরই। তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে কেবল অংশগ্রহণ ছাড়া থাকে বাড়তি কিছু করার তাগিদও। “গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ”খ্যাত প্রতিযোগিতায় দেশের জার্সিতে নাম উজ্জ্বল করার সুযোগ কে-ই বা হাতছাড়া করতে চায়!
তরুণ বয়সে বিশ্বকাপ মাতিয়ে কেউ কেউ পরবর্তীতে ফুটবলের মহাতারকা হয়েছেন, আবার অনেকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছেন কালের অতল গহ্বরে। তবে তাদের অনেকেই নিজ দলের হয়ে গোল করে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতাদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন।
চলুন তাহলে দেখে নিই তরুণ বয়সে নিজের প্রথম ফিফা বিশ্বকাপেই গোল করে জায়গা করে নিয়েছেন টুর্নামেন্টের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ৫ গোলদাতার ছোট্ট তালিকায়-
দিমিত্রি সাইচেভ (রাশিয়া)- ১৮ বছর ২৩২ দিন
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে দুর্বার গতি আর ক্ষিপ্রতার জন্য আলাদাভাবে নজর কেড়েছিলেন দিমিত্রি সাইচেভ। মূল পজিশন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হলেও গোলবারের সামনে এই রাশিয়ানের ফিনিশিং ছিল চরম নিখুঁত। তবে তরুণ বয়সে প্রতিভাবান হওয়ায় তার মধ্যে অনেকে যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন, তার ছিটেফোঁটাও পূরণ হয়নি।
২০০২ বিশ্বকাপে রাশিয়ার দিমিত্রি সাইচেভ/সংগৃহীতরাশিয়া জাতীয় দলের ফুটবল ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ২০০২ বিশ্বকাপে এসেছিলেন সাইচেভ। তার দল রাশিয়া প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নেয়। তবে ওই বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোল করেছিলেন এই রাশিয়ান, যার বদৌলতে ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৫ম সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হন তিনি।১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম আসরে ইউরোপের যে গুটিকয়েক দেশ অংশ নিয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল রোমানিয়া। আর সেই রোমানিয়ার হয়ে মাঠ মাতিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকা হয়ে উঠেছিলেন নিকোলাস কোভাকস।
রোমানিয়া-হাঙ্গেরির দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলেও উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম ফিফা বিশ্বকাপে কোভাকস প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন রোমানিয়ানদের হয়েই। যদিও সেই বিশ্বকাপে রোমানিয়ার হয়ে মাত্র একবার গোলের দেখা পেয়েছিলেন এই ফরোয়ার্ড। তবে পেরুর বিপক্ষে পাওয়া সেই গোলের মাধ্যমে কোভাকস আজও ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৪র্থ সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা।
মাইকেল ওয়েন (ইংল্যান্ড)- ১৮ বছর ১৯০ দিন
ইংলিশ ফুটবলের ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব হয়েছিল মাইকেল ওয়েনের। তরুণ বয়সে প্রতিভার কারণে এই ফরোয়ার্ডকে অনেকেই পরবর্তী পেলে হিসেবে অ্যাখ্যা দিতেন। ক্রমাগত ইনজুরিতে ক্যারিয়ার বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ার আগে তার মাঝে ইংলিশ ফুটবলের সম্ভাব্য পরবর্তী মহাতারকাকে দেখতেন অনেকেই।
১৯৯৮ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের মাইকেল ওয়েন/টুইটার মাইকেল ওয়েন যদিও সেই মহাতারকা হতে পারেননি, তবে সেই পথে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারতো ১৯৯৮ বিশ্বকাপ। ফ্রান্সে অনুষ্ঠেয় সেই বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এই ইংলিশ ফরোয়ার্ডের সেই গোলটি এখনও চোখে লেগে আছে। তবে এর আগে গ্রুপপর্বে রোমানিয়ার বিপক্ষে গোল পেয়েছিলেন ওয়েন। সেই ম্যাচে ইংল্যান্ড হেরে গেলেও এই স্ট্রাইকার হয়ে যান ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা।
ম্যানুয়েল রোসাস (মেক্সিকো)- ১৮ বছর ৯৩ দিন
মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসে ম্যানুয়েল রোসাস নামটি অত্যন্ত সম্মানীয়। উত্তর আমেরিকান দেশটির বিভিন্ন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা আজও তার নাম সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করে থাকেন। সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৩০ সালে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নিয়েছিলেন রোসাস।
ফুটবল মাঠে রোসাসের পজিশন সেন্টারব্যাক হলেও সেই বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে সেবারের রানার্সআপ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জোড়া গোল করেন রোসাস। সেই ম্যাচে হারার পাশাপাশি নিজ গ্রুপের সর্বশেষ দল হিসেবে বিশ্বকাপ থেকে মেক্সিকো বিদায় নেয়। কিন্তু এই মেক্সিকান ডিফেন্ডার উঠে আসেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতাদের তালিকায়, যেখানে তার অবস্থান দুইয়ে।
পেলে (ব্রাজিল)- ১৭ বছর ২৩৪ দিন
ফুটবল ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক মহাতারকা হিসেবে বিবেচনা করা হয় পেলেকে। নিজ প্রতিভায় ফুটবলকে ভিন্ন এক রূপে নিয়ে গিয়ে হয়ে ওঠেন সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের অন্যতম। একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ তিন বিশ্বকাপ জেতার কীর্তি রয়েছে শুধু এই জীবন্ত কিংবদন্তিরই।
১৯৫৮ বিশ্বকাপে ১৬ দিনের ব্যবধানে তিনটি রেকর্ড গড়েছিলেন পেলে, যা আজও কেউ ভাঙতে পারেনি পেলে সংগৃহীত১৯৫৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে মাতিয়েছিলেন পেলে। সেলেসাওদের বিশ্বকাপ জেতানোর পথে সুইডেনে অনুষ্ঠেয় ১৯৫৮ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েলসের বিপক্ষে গোল করেন এই ফরোয়ার্ড।
মাত্র ১৭ বছর ২৩৪ দিন বয়সে বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রথমবারের মতো বল জালে জড়িয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নেন পেলে। আজ পর্যন্ত এই ব্রাজিলিয়ানের কাছ থেকে সেই রেকর্ড কেউ ছিনিয়ে নিতে পারেননি।



