Friday, May 24, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

দুই দফা লড়াইয়েও চূড়ান্ত হয়নি সেই বিশ্বকাপ ফাইনালের বিজয়ী

ফাইনালটি টুর্নামেন্টের ইতিহাসে তো বটেই, ওয়ানডে ইতিহাসেরও তর্কসাপেক্ষে সেরা ম্যাচ

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৩, ০৮:৪৪ পিএম

গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা ক্রিকেট। যে ফরম্যাটই হোক, ক্রিকেটের পরতে পরতে উত্তেজনার প্রলেপ। চোখের পলকেই পাল্টে যায় ম্যাচের গতিপথ। শুধু তাই না, অজান্তেই যেন কোনো না কোনো মুহূর্তের কারণে যেন ম্যাচেরই পেন্ডুলাম হেলে যায়। ক্ষণিকের আভা যে খেলার ফলাফল অনেকাংশে নির্বারিত হয়ে যায়, তাকে গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা না বলে উপায় কী!

ভারতের মাটিতে আগামী অক্টোবর-নভেম্বরে বসছে ওয়ানডে বিশ্বকাপের ত্রয়োদশ আসর। টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে যখন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড আর বর্তমান রানার্সআপ নিউজিল্যান্ড পরস্পরের বিরুদ্ধে মাঠে নামবে, তখন দুই দলের চোখে নিশ্চয়ই চার বছর আগের স্মৃতি জ্বলজ্বল করে উঠবে।

যেকোনো টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ মানেই শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই। আর সেটা যদি হয় আইসিসি আয়োজিত বিশ্বকাপের ফাইনাল, তাহলে তো কথাই নেই। আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং হাড্ডাহাড্ডি ফাইনালের কথা বললে ক্রিকেটপ্রেমীরা চোখ বন্ধ করে ২০১৯ সালের লর্ডসে ম্যাচটির কথা বলবেন। আর বলবেন নাই বা কেন? পুরো ম্যাচে কাউকেই এককভাবে শিরোপার জন্য নিরঙ্কুশ দাবিদার বলার উপায় ছিল না। স্বয়ং ক্রিকেট দেবতাও হয়তো বিজয়ী বেছে নিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। তা না হলে দুই দফা লড়াই শেষেও কেন সরাসরি কাউকে বিজয়ী হিসেবে বেছে নেওয়া যাবে না?

মরগ্যান-উইলিয়ামসন

“ক্রিকেট তীর্থ” লর্ডসে ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই দ্বাদশ আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড। দুই দলের সামনেই ছিল প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার হাতছানি। ঘরের মাঠে নিজেদের দর্শকের সামনে আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের ৪৪ বছরের ইতিহাসে ইংলিশদের সামনে ছিল প্রথমবারের মতো শিরোপা জেতার উপলক্ষ। অন্যদিকে, কিউইদের সামনে ছিল আগের আসরে ফাইনালে হারের ক্ষতে প্রলেপ দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ। রাউন্ড রবিন ফরম্যাটে আয়োজিত ওই আসরের গ্রুপপর্বে নিউজিল্যান্ডকে ১১৯ রানে উড়িয়ে দিয়েছিল স্বাগতিক ইংল্যান্ড।

ফাইনালে আসার পথে শেষ চারে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়াকে ৮ উইকেটে হারায় স্বাগতিক ইংল্যান্ড। পক্ষান্তরে, বৃষ্টির বাধায় রিজার্ভ ডেতে গড়ানো অপর সেমিফাইনালে ভারতকে ১৮ রানে হারায় নিউজিল্যান্ড। উইনিং কম্বিনেশন ধরে রাখতে সেমিফাইনালের অপরিবর্তিত একাদশ নিয়েই ফাইনালে মাঠে নামে ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড। ফাইনালের ভেন্যু লর্ডসের পিচে ঘাসের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। পাশাপাশি এক পশলা বৃষ্টিতে ফাইনাল নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ১৫ মিনিট দেরিতে শুরু হয়। আকাশ মেঘাছন্ন থাকলেও টস জিতে ব্যাটংয়ের সিদ্ধান্ত নেন নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক কেইন উইলিয়ামসন। বলে রাখা ভালো, সেবার পঞ্চমবারের মতো ফাইনালের পর্দা নামে লর্ডসে। আর আগের চার ফাইনালেই টসজয়ী দল পরাজিত হয়েছিল!

সে যাই হোক, আগে বোলিংয়ে নামাটা ইংল্যান্ডের জন্য যেন শাপেবরই হয়েছিল। উপযুক্ত কন্ডিশনের পূর্ণ ফায়দা তুলে সুইংয়ের বিষে নিউজিল্যান্ডের দুই ওপেনার মার্টিন গাপটিল ও হেনরি নিকোলসকে প্রতিনিয়ত বিপদে ফেলছিলেন দুই ইংলিশ পেসার ক্রিস ওকস ও জোফরা আর্চার। পুরো আসরে খোলসবন্দি গাপটিল ফাইনালে দারুণ কিছুর ইঙ্গিত দিয়ে শেষ পর্যন্ত হতাশ করেন। দলীয় ২৮ আর ব্যক্তিগত ১৯ রানে ওকসের বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়ে সাজঘরে ফেরেন কিউই ওপেনার। প্রথম উইকেট পতনের পর ক্রিজে আসেন অধিনায়ক উইলিয়ামসন। পুরো আসরেই ব্ল্যাক ক্যাপসদের ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালন করা উইলিয়ামসন উইকেটে এসে আরেক ওপেনার নিকোলসকে সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে প্রাথমিক বিপদ সামলে ইনিংস মেরামতের কাজ চালাতে থাকেন।

টম ল্যাথাম

শুরুতে রান তোলার ক্ষেত্রে কিছুটা ধীরগতি থাকলেও পরে দুজনই রানরেট প্রায় পাঁচের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সেটিই যেন কাল হয়ে দাঁড়ালো নিউজিল্যান্ডের জন্য। কারণ এরপরই জোড়া আঘাত করে পার্টি ক্র্যাশারের ভূমিকায় হাজির হয়ে যান লিয়াম প্লাঙ্কেট। ২৩তম ওভারে উইলিয়ামসনের বিদায়ে ভেঙে যায় ৬৮ রানের জুটি। তবে সেটির জন্য ইংল্যান্ডকে রিভিউয়ের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। গুড লেংথে প্লাঙ্কেটের ফেলা বলটি উইলিয়ামসনের ব্যাটের ছোঁয়া পেয়ে উইকেটরক্ষক বাটলারের হাতে ঠাঁই পেলেও সেটি আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনার নজর এড়িয়ে যায়। তবে পরে রিভিউ নিয়ে কিউই অধিনায়কের গুরুত্বপূর্ণ উইকেটটি বুঝে নেয় ইংল্যান্ড। দলীয় ১১৫ রানে প্লাঙ্কেট বোল্ড করেন বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ফিফটি তুলে নেওয়া নিকোলসকে (৫৫)।

দলের প্রথম তিন ব্যাটারের বিদায়ের পর চারে নামা অভিজ্ঞ রস টেলরের ওপর নিউজিল্যান্ডের ইনিংসের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছিল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য দলীয় ১৪১ রানে আউট হয়ে ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ৯০ বলে ৭৪ রান করা টেলর সেই ভরসার দাম দিতে পারলেন না। তাতে অবশ্য তার চেয়ে আম্পায়ার ইরাসমাসের ভুলের দায় বেশি। ৩৩তম ওভারের প্রথম বলে মার্ক উডের বল ঠিকভাবে খেলতে পারেননি টেলর। বল প্যাডে লাগে। তবে খালি চোখেই মনে হচ্ছিল বল স্ট্যাম্পের অনেক ওপর দিয়ে যাবে। কিন্তু আম্পায়ার ইরাসমাস সোজা তর্জনী উঁচিয়ে আউটের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন। সতীর্থ গাপটিল আগেই রিভিউ খোয়ানোর ফলে টেলর আর আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেননি। পরে রিপ্লেতে আম্পায়ারের ভুল ধরা পড়ে।

চাপে পড়ে গেলেও নিউজিল্যান্ডের ইনিংস পথ হারায়নি। এর পেছনে বড় অবদান টম ল্যাথামের। টেলরের বিদায়ের পর আর কেউ মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারায় এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে লড়ে যান পুরো টুর্নামেন্টে ফর্মের বাইরে থাকা কিউই উইকেটরক্ষক। ৪৯তম ওভারে সপ্তম ব্যাটার হিসেবে সাজঘরে ফেরার আগে পঞ্চম উইকেটে জেমস নিশামকে (১৯) নিয়ে ৩২ আর ষষ্ঠ উইকেটে কলিন ডে গ্র্যান্ডহোমের (১৬) সঙ্গে ৪৬ রান তোলেন ল্যাথাম। আউট হওয়ার আগে ৫৬ বলে দুই চার ও এক ছয়ে তার ব্যাট থেকে আসে ৪৭। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে ৮ উইকেটে ২৪১ রানের সংগ্রহ দাঁড় করাতে সমর্থ হয় নিউজিল্যান্ড। ইংলিশ বোলারদের মধ্যে দুই পেসার ওকস এবং প্লাঙ্কেট ৩টি করে উইকেট নেন।

টম ল্যাথাম

ব্ল্যাক ক্যাপসদের সামনে জয়ের একমাত্র অনুপ্রেরণা ছিল ভারত।  ফাইনালে আগে ব্যাটিং করে ২৫০ এর কম লক্ষ্য দিয়ে জেতার একমাত্র নজির গড়ে ১৯৮৩ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছিল ভারতীয়রা। তবে যতই অনুপ্রেরণা থাক, মারকাটরি ক্রিকেটের রমরমা যুগে ২৪২ রান আহামরি কোনো লক্ষ্য না। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের ইনিংস শেষেই সাবেক কিউই অধিনায়ক ব্রেন্ডন ম্যাককালাম বলে দিয়েছিলেন, এ উইকেটে ২৪১ রান যথেষ্ট। যাই হোক, তার কথাকে সত্যি প্রমাণ করতেই যেন মরিয়া হয়ে ওঠেন নিউজিল্যান্ডের বোলাররা। লর্ডসের সবুজ উইকেটে আসরের সেরা বোলিং লাইনআপের বিরুদ্ধে এ রান তুলতেও স্বাগতিকদের কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে, তার ইঙ্গিত মিলেছিল শুরুতেই।

ইনিংসের প্রথম বলেই বোল্টের বলে এলবিডব্লিউ হতে পারতেন ইংল্যান্ডের তুরুপের তাস জেসন রয়। কিন্তু সেই দফায় একদম অল্পের জন্য বেঁচে যান এ ইংলিশ ব্যাটার। আম্পায়ার আউট না দেওয়ায় প্রথম বলেই রিভিউ নিয়ে বসেন অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন। টিভি রিপ্লে দেখিয়েছে, বলটা আধা ইঞ্চি এদিক-ওদিক হলেই রয়কে ফিরতে হতো শূন্য রানে। তবে ভাগ্যের সহায়তা পেয়েও রয়ের ইনিংস দীর্ঘায়ু হয়নি। ইনিংসের ষষ্ঠ ওভারে দলীয় ২৮ রানে ইংল্যান্ডের প্রথম ব্যাটার হিসেবে প্যাভিলিয়নে ফেরেন রয়। কিউই পেসার ম্যাট হেনরির হালকা আউট সুইংয়ে খোঁচা দিয়ে উইকেটরক্ষক টম ল্যাথামকে ক্যাচ দেন এ ইংলিশ ওপেনার।

আরেক ওপেনার জনি বেয়ারস্টোকে নিয়ে প্রাথমিক ধাক্কা সামলানোর দায়িত্ব ছিল ইংল্যান্ডের বচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটার জো রুটের ওপর। কিন্তু সুইংয়ের সামনে রীতিমতো খাবি খেয়ে একের পর এক ডটে ধীরগতিতে ব্যাট চালানোয় নিজের ওপরই চাপ নিয়ে ফেলছিলেন রুট। সেই চাপের কাছেই নতি স্বীকার করে কলিন ডি গ্র্যান্ডহোমের অফ স্টাম্পের অনেক বাইরে দিয়ে চলে যাওয়া বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন রুট। আউট হওয়ার আগে মাত্র ৭ রান করলেও খরচ করে ফেলেছিলেন ৩০টি বল। এরপর বেয়ারস্টোর উপর একটু বাড়তি দায়িত্ব ছিল। এ ইংলিশ ওপেনার ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি বেশ ভালো ছন্দেই আছেন। কিন্তু লকি ফার্গুসনের বলে ব্যক্তিগত ৩৬ রানে বোল্ড হয়ে ইংল্যান্ডের বিপদ আরও বাড়িয়ে দেন তিনি।

বিশ্বকাপ ফাইনাল বেন স্টোকস

ইনিংসের ২৪তম ওভারে ইংল্যান্ডের বিপদ আরও বাড়ে, যখন জিমি নিশামের করা প্রথম বলেই সাজঘরে ফিরে যান দলীয় অধিনায়ক এডউইন মরগ্যান। রানের গতি বাড়াতে অনেক বাইরের বল কাট করতে গিয়েছিলেন ২২ বলে ৯ রান করা মরগ্যান, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। ডিপ কভার থেকে অনেকটা দৌড়ে এসে সামনের দিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্ত এক ক্যাচ ধরেছেন ফার্গুসন। ক্ষিপ্রগতিতে ছুটে এসে ফার্গুসনের ক্যাচটি নিশ্চিতভাবেই সেটি বিশ্বকাপ ফাইনালের অন্যতম সেরা ক্যাচ হয়ে থাকবে। মরগ্যান যখন বিদায় নিয়েছেন, ৪ উইকেট হারিয়ে ইংল্যান্ডের সংগ্রহ তখন ৮৬ রান। পেন্ডুলামের কাঁটাও যেন হুট করেই নিউজিল্যান্ডের দিকে হেলে গেল।

১০০ রানের আগেই ৪ ব্যাটার হারিয়ে ইংল্যান্ড যখন ধুঁকছে, তখন ইংলিশদের ম্যাচে ফেরার একমাত্র আশা বেন স্টোকস আর উইকেটরক্ষক জস বাটলারের জুটি। দুজনই ধুমধাড়াক্কা ব্যাটিংয়ের জন্য বিখ্যাত হলেও পরিস্থিতির দাবি মিটিয়ে হিসেবিভাবে ব্যাট চালিয়ে  দলকে বিপদ থেকে টেনে তুলতে থাকেন। দুজনের অর্ধশতকে পঞ্চম উইকেটে ১১০ রান তুলে ফেলে। তখন মনে হচ্ছিল স্টোকস-বাটলারের জুটিতে ইংল্যান্ড বুঝি সহজ জয়ের দিকেই হাঁটছে। কিন্তু হঠাৎ আচমকা এক ঝড়ে আবারও ম্যাচের গতিপথ পাল্টে যায়। ৪৫তম ওভারে দলীয় ১৯৬ রান ফার্গুসনের বলে বদলি সাউদির হাতে তালুবন্দি হয়ে ৫৯ রানে আউট হন। জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের তখনও ৩১ বলে ৪৪ রান করতে হবে।

সেই ফার্গুসনের করা ৪৬তম ওভারের প্রথম বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে অলরাউন্ডার ক্রিস ওকসও প্যাভিলিয়নের পথ ধরলে বেশ ভালোভাবেই ম্যাচে ফিরে আসে নিউজিল্যান্ড। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিততে ইংলিশদের তখনও ২৩ বলে ৩৯ রান। ৬ উইকেট হারানো যেকোনো দলের জন্যই কাজটা বেশ কঠিন। তবে তখনও উইকেটে স্টোকস টিকে থাকায় ইংল্যান্ডের জয়ের আশা বেঁচে ছিল। তবে স্টোকসকে ভালো সঙ্গই দিচ্ছিলেন বল হাতে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া প্লাঙ্কেট। কিন্তু ৪৯তম ওভারে জিমি নিশামের বলে ১০ বলে ১০ রান করে ফিরে যান তিনি। শেষ ৯ বলে তখন স্বাগতিকদের দরকার ২২ রান। জিততে হলে অবিশ্বাস্য কিছুই করতে হতো ইংল্যান্ডকে।

ওই ওভারে নিশামের বলে স্লগ সুইপ হাঁকালেন স্টোকস। লং অনের বাউন্ডারি লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেন্ট বোল্ট সেই ক্যাচটা ধরেও ফেলেছিলেন। কিন্তু ভারসাম্য রাখতে না পারায় কিউই পেসার বল তুলে দিলেন সতীর্থ গাপটিলের হাতে। তবে ততক্ষণে যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে। গাপটিলের হাত থেকে বল ছুঁড়ে মারার আগেই বোল্টের পা বাউন্ডারি সীমানার দড়ি স্পর্শ করেছিল, ফলে নিশ্চিত আউটের পরিবর্তে উল্টো ছক্কা হাঁকিয়ে দেন স্টোকস! তবে হাল ছেড়ে নিশামও একট শেষ চেষ্টা চালালেন। ওই ওভারের শেষ বলে আর্চারকে বোল্ড করে ম্যাচটাকে আবারও জমজমাট করে তোলার ইঙ্গিত দেন কিউই পেসার। ৪৯ ওভার শেষে ইংল্যান্ডের স্কোর তখন ২২৭/৮।

বেন স্টোকস

জয়ের জন্য ৬ বলে ইংল্যান্ডের প্রয়োজন ১৫ রান। স্ট্রাইকিং প্রান্তে আছেন সেই স্টোকস, যিনি ২০১৬ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ফাইনালে শেষ ওভারে চার ছক্কা হজমের জ্বালা বয়ে চলেছেন। অন্যদিকে, শেষ ওভারে করতে বোলিংয়ে এলেন বোল্ট, একটু আগেই যিনি স্টোকসের নিশ্চিত ক্যাচকে ছক্কা বানিয়ে নিউজিল্যান্ডের হাতে থাকা ম্যাচটিকে ফসকে ফেলেছেন। প্রথম দুই বলে অসাধারণভাবে দুইটা ডট আদায় করে নিয়ে বোল্ট যেন আগের ওভারে করা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। শিরোপা জিততে ইংলিশদের তখন ৪ বলে প্রয়োজন ১৫ রান, নিশ্চিতভাবেই যা হিমালয় পাড়ি দেওয়ার সমতুল্য। তবে আচমকাই আবার নাটকের শেষ অঙ্কে বড় পালাবদল এলো।

বোল্টের করা শেষ ওভারের তৃতীয় বলে স্লগ সুইপে ছক্কা মেরে সবাইকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করলেন স্টোকস। তবে ৩ বলে ইংলিশদের তখনও ৯ রান দরকার। দুই দলের দিকেই পাল্লা সমান ভারী হলেও ব্ল্যাক ক্যাপসরাই খানিকটা এগিয়ে। শেষ ওভারের চতুর্থ বলে অবশ্য বাউন্ডারি হাঁকাতে পারলেন না স্টোকস, ডিপ মিড উইকেটে বল ঠেলে দিয়ে পড়িমড়ি করে ছুটলেন দুই রানের জন্য। ওদিকে স্টোকসকে রান আউট করার জন্য দুর্দান্ত এক থ্রোয়ে বল তার (স্ট্রাইকিং) প্রান্তে ছুঁড়ে দিলেন গাপটিল। বাঁহাতি ইংলিশ অলরাউন্ডার, বাকি খেলোয়াড় থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামে উপস্থিত ও বিশ্বের তাবৎ দর্শক হয়তো তখনও জানেন না সামনে তারা সবাই কী এক অদ্ভুতুড়ে পরিস্থিতির সাক্ষী হতে যাচ্ছেন।

গাপটিলের থ্রোয়ে বল যখন স্ট্রাইকিং প্রান্তের স্টাম্প আর পেছনে দাঁড়ানো উইকেটরক্ষক ল্যাথামের দিকে আসছে, তখন নিজেকে রানআউট থেকে বাঁচাতে ক্রিজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন স্টোকস। কিন্তু তার ব্যাটে লেগে দিক পরিবর্তন করে চলে গেল থার্ডম্যান এরিয়ার দিকে। সেখানে নিউজিল্যান্ডে কোনো ফিল্ডার না থাকায় শেষ পর্যন্ত বল থামলেও ততক্ষণে সেটি সীমানা পেরিয়ে গেছে। পুরো ঘটনা এবং স্টোকসের ক্ষমা প্রার্থনাসুলভ চাহনি দেখে তখনই বোঝা গেছে, এ বাউন্ডারি হওয়ায় তার ইচ্ছাকৃত কোনো হাত ছিল না। নিতান্ত অনিচ্ছাকৃতভাবেই ঘটে গেছে। কিন্তু ততক্ষণে নিউজিল্যান্ডের কপাল পোড়ার উপক্রম। মাঠের সহকর্মী আম্পায়ার ইরাসমাসের সঙ্গে আলোচনা করে স্কোরবোর্ডে ৬ রান (দৌড়ে ২ রান ও ওভারথ্রোতে ৪ রান) যোগ করার সংকেত দেন অপর আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা।

কিন্তু তাতে বিতর্কের ছোঁয়াও ছিল। সব মহলেরই প্রশ্ন, ওটা ৬ রান নাকি ৫ রান হবে? আর এ প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিয়েছে ক্রিকেটেরই ফিল্ডারদের ওভারথ্রো কিংবা ইচ্ছাকৃত কাজ নিয়ে আইনের ১৯.৮ অনুচ্ছেদ। সেখানে বলা হয়েছে, ফিল্ডারের ওভারথ্রো কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে করা কোনো কিছু থেকে বাউন্ডারি হলে...বাউন্ডারির সঙ্গে ব্যাটারারা একসঙ্গে যত রান নিয়েছেন সেটাও যোগ হবে। তবে এক্ষেত্রে থ্রোয়ের সময় তাদের একে অপরকে পার হয়ে যেতে হবে। রিপ্লে দেখে পরিষ্কার বোঝা গেছে, গাপটিল থ্রো করার সময় ইংল্যান্ডের দুই ব্যাটসম্যান বেন স্টোকস ও আদিল রশিদ দ্বিতীয় রান নেওয়ার জন্য একে অপরকে ক্রস (পার হওয়া) করেননি। অর্থাৎ গাপটিল যখন থ্রোয়ের জন্য বল তুলছিলেন, স্টোকস ননস্ট্রাইক প্রান্তে আর আদিল রশিদ স্ট্রাইকারের প্রান্তে ছিলেন। অর্থাৎ দৌড়ে ২ রান নয়, ১ রান হবে আর সঙ্গে বাউন্ডারি- মোট ৫ রান।

বেন স্টোকস ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনাল

আইনের মাঝে থাকা ফাঁক আর অস্পষ্টতার কারণেই এ প্রশ্ন উঠেছে। কারণ ফিল্ডারদের থ্রো নিয়ে যেমন পরিষ্কার করে কিছু বলা হয়নি, তেমনি পুরো পরিস্থিতিতে ব্যাটারদের ভূমিকা নিয়েও স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। গাপটিলের থ্রো কিন্তু উইকেটরক্ষক বরাবরই ছিল। ব্যাটসম্যানের ব্যাটে লাগার কারণে তা ওভারথ্রো হয়েছে। সে যাই হোক, দুই রানের বদলে ৬ রান চলে আসায় জেতার জন্য বাকি ২ বলে মাত্র ৩ রান দরকার ইংল্যান্ডের। দুর্ভাগ্যের কাছে মাথা না নুইয়ে নিজেদের সেরাটা দিয়ে লড়তে থাকে নিউজিল্যান্ড। বোল্টের করা পঞ্চম বল লং অফে পাঠিয়ে অসম্ভব এক দুই রানের পিছনে ছোটেন স্টোকস। সেই যাত্রায় অবশ্য স্টোকস সফল হননি, ভাগ্যও আর আগের মতো সাহায্য করেনি। ফলে আদিল রশিদ রানআউট হলে এক রানই যোগ হয় ইংলিশদের সংগ্রহের খাতায়।

বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বলে জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের দরকার ২ রান আর নিউজিল্যান্ডের প্রয়োজন ডট বল। অন্যদিকে, ইংল্যান্ড এক রান নিতে সমর্থ হলে ম্যাচ গড়াবে সুপার ওভারে! শেষ বলের অতিরিক্ত চাপের ফলেই হয়তো বোল্ট দিয়ে বসলেন ফুলটস। কিন্তু স্ট্রাইকিং প্রান্তে আরও বেশি চাপে থাকা স্টোকস সেই ফুলটসকে সজোরে মারার চেষ্টা না করে আলতো করে লং অনের দিকে ঠেলে দিলেন। লক্ষ্য আগের মতোই দুই রান। কিন্তু এ যাত্রায়ও ব্যর্থ হলেন স্টোকস। অপর প্রান্তে থাকা উড দ্বিতীয় রানের চেষ্টা করতে গেলে নিশামের অসাধারণ থ্রো থেকে বল পেয়ে উড ক্রিজে আসার আগেই স্টাম্প ভেঙে দেন বোল্ট। ৯৮ বলে পাঁচ বাউন্ডারি ও দুই ছক্কায় ৮৪ রানে অপরাজিত স্টোকস হতে হতেও নায়ক হতে পারলেন না।

বেন স্টোকস

প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনাল টাই হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ সাড়ে সাত ঘন্টার অবিশ্বাস্য এক লড়াই শেষে ম্যাচ গড়ালো সুপার ওভারের রোমাঞ্চে। মূল ম্যাচে রান তাড়া করায় নিয়ম অনুযায়ী সুপার ওভারে আগে ব্যাট করতে নামে ইংল্যান্ড। ইংলিশদের পক্ষে ব্যাট হাতে নামেন তাদের ইনিংসের সেরা দুই ব্যাটার স্টোকস ও বাটলার। অন্যদিকে, শেষ ওভারের মতো এখানেও নিউজিল্যান্ডের পক্ষে বল হাতে নিলেন বোল্ট। স্টোকসের ৩ বলে ৮ রান আর বাটলারের ৩ বলে ৭ রানে বোল্টের সুপার ওভার থেকে ১৫ রান তুলে নেয় স্বাগতিকরা। কোনো ছক্কা না থাকলেও দুই ইংলিশ ব্যাটারের ব্যাট থেকেই একটি করে বাউন্ডারি এসেছিল। জয়ের জন্য সুপার ওভারে নিউজিল্যান্ডকে করতে হতো ১৬ রান, ১৫ রান করলে সুপার ওভারও টাই হবে।

পুরো আসরে বাজে ব্যাটিং করা নিউজিল্যান্ডকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতানোর গুরুদায়িত্ব দিয়ে গাপটিল আর নিশামকে মাঠে পাঠালেন উইলিয়ামসন। দুজনই হার্ড হিটার হলেও স্ট্রাইকে গেলেন নিশাম। অন্যদিকে, সুপার ওভার সামলাতে ডেথ ওভারে নিজেদের সেরা বোলার জোফরা আর্চারের হাতেই ভার তুলে দেয় ইংল্যান্ড। তবে সুপার ওভারের চাপে পড়েই কি-না প্রথম বলেই ওয়াইড দিয়ে বসেন এ ইংলিশ পেসার। ক্যারিবীয় বংশোদ্ভুত বোলারের ওপর যেন চাপ আরও বেড়ে গেল। আর্চারের পুনরায় করা প্রথম বল থেকেই দুই রান নেন। পরের বলে ইয়র্কার দিতে গিয়ে স্লটে বল দিয়ে বসেন আর্চার, তার ফায়দা লুটে ছক্কা হাঁকিয়ে নেন নিশাম। ছয় বলে ১৬ রান থেকে সমীকরণ নেমে আসে চার বলে সাত রানে! ম্যাচের পেন্ডুলাম যেন ফের একবার ব্ল্যাক ক্যাপসদের দিকে হেলে গেল।

পরের দুই বলে কোনো বাউন্ডারি না এলেও ইংল্যান্ডের মিসফিল্ডিং আর ভুল প্রান্তে থ্রোয়ের ফায়দা লুটে চার রান তুলে ফেলে নিউজিল্যান্ড। ফলে জয়ের জন্য দুই বলে কিউইদের প্রয়োজন ৩ রান। মূল ম্যাচেও ইংল্যান্ডের শেষ বলে দরকার ছিল ঠিক ৩ রান! আর্চারের করা সুপার ওভারের পঞ্চম বলে নিশামকে কেবল সিঙ্গেল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো। পুরো সুপার ওভার নিশাম সামলালেও শেষ বলটি মোকাবিল করে ২ রান তোলার ভার এসে পড়ে গাপটিলের ওপর, যিনি ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে মহেন্দ্র সিং ধোনিকে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে করা ওই অবিশ্বাস্য রানআউট ব্যাতিত পুরো আসরেই ছিলেন নিজের ছায়া। অন্যদিকে বল হাতে আছেন আর্চার, যাকে দলে নিতে প্রচলিত নিয়মে পরিবর্তন এনে টুর্নামেন্টের আগে একদম শেষ মুহূর্তে ডেভিড উইলিকে বাদ দেওয়ায় সমালোচনাও কম হয়নি। দুজনের সামনেই নায়ক হওয়ার হাতছানি।

সুপার ওভারের শেষ বলটি একদম গাপটিলের পা বরাবর ফুল লেংথে ফেলেন আর্চার। ডিপ মিড উইকেটে বল পাঠিয়ে দ্রুত এক রান নিয়ে দ্বিতীয় রানের জন্য চেষ্টা করলেন গাপটিল। বাজে এক বিশ্বকাপ কাটানো কিউই ওপেনার শেষটা ভালো করে সব ভুলিয়ে দিতে পারলেন না। কারণ ফিল্ডার জেসন রয় কোনো ভুল করেননি, তার নিঁখুত থ্রোয়ে বল এসে জমা পড়ে ইংলিশ উইকেটরক্ষক বাটলারের গ্লাভসে। গাপটিল ক্রিজে প্রবেশ করার আগেই উইকেট ভেঙে দিলেন বাটলার। মূল ম্যাচের পর নাটকীয়ভাবে সুপার ওভার শেষেও সমতায় রয়ে যায় দুই দল। কিন্তু উইকেট ভেঙে দেওয়ার পরই আনন্দে পাগলের মতো ছুটতে শুরু করেন বাটলার। সেই সঙ্গে তাকে অনুসরণ করতে থাকে গোটা ইংল্যান্ড দল। কারণটা খোলাসা করা যাক।

ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ জয়

নিয়ম অনুযায়ী, মুল ম্যাচের পর সুপার ওভারেও যদি দুই দল সমান রান করে, তখন চলে আসবে বাউন্ডারির হিসাব। মূল ম্যাচ ও সুপার ওভার মিলিয়ে যে দল সবচেয়ে বেশি বাউন্ডারি মারবে, তারাই জিতবে সুপার ওভার। সেখানে যদি দুই দল সমতায় থাকে, তখন দেখা হবে সুপার ওভারে কারা বাউন্ডারি বেশি মেরেছে। মূল ম্যাচে নিউজিল্যান্ড ১৬টি আর ইংল্যান্ড ২৪টি বাউন্ডারি মেরেছিল। ফলে  ফলে সুপার ওভারে নিউজিল্যান্ড যত বাউন্ডারিই মারুক না কেন, ইংল্যান্ডকে টপকাতে পারত না তারা। শেষ পর্যন্ত সুপার ওভার শেষে বাউন্ডারির হিসাবে কিউইদের ২৬-১৭ ব্যবধানে হারিয়ে মহানাটকীয় এক লড়াই শেষে তিনটি ফাইনাল হারার দুঃখ মুছে প্রথমবারের মতো বিশ্বচাম্পিয়ন হয় ইংল্যান্ড। অবশেষে ক্রিকেট খেলার জন্মদাতাদের হাতে ওঠে পরম প্রার্থিত বিশ্বকাপ শিরোপা।

ইংল্যান্ড শিরোপা

ইংল্যান্ড দল যখন আনন্দে উন্মাতাল, তখন বিপরীত মেরুতে আক্ষেপে মাথা নুইয়ে ফেলেছেন গাপটিল, তাকে সান্ত্বনা দিতে আসা নিশামও যেন শোকে বাকরুদ্ধ। অবস্থা বুঝতে পেরে উদযাপন থামিয়ে নিউজিল্যান্ডের দুই খেলোয়াড়কে সমবেদনা জানাতে এগিয়ে আসেন ইংলিশ খেলোয়াড়েরা। মূল ম্যাচ সুপার ওভারেও ম্যাচ টাই হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী ইংল্যান্ডই জয়ী দল। কিন্তু নিরপেক্ষ বিচার থেকে খোদ ইংলিশ সমর্থকও বোধহয় ব্ল্যাক ক্যাপসদের পরাজিত দল বলতে পারতেন না। কিন্তু বেশি বাউন্ডরি মারার অদ্ভুত নিয়ম মারপ্যাঁচে পড়ে নিউজিল্যান্ডকে থাকতে হলো পরাজিত দলে। ফাইনাল শেষে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার ব্রেট লি, খ্যাতনামা ক্রিকেট সংবাদকর্মী ব্রেইডন কভারডেল, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার ডিন জোন্স, ভারতের বিশ্বকাপজয়ী ওপেনার গৌতম গম্ভীর আর অলরাউন্ডার যুবরাজ সিংও নিয়মটির সমালোচনা করেন।

নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট দল

ফাইনালে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে নেন বেন স্টোকস। বিচিত্র এই পৃথিবীর সমস্ত রূপই হয়তো ততদিনে দেখে ফেলেছেন এ ইংলিশ অলরাউন্ডার। তিন বছর আগে ইডেন গার্ডেনে ব্রাথওয়েটের কাছে টানা চার ছক্কা খেয়ে ফাইনাল হারার পর স্টোকসের কান্নাভেজা মুখ কে ভুলতে পারে? পরের বছরই পানশালায় গিয়ে মারপিটের অপরাধে জড়িয়ে স্টোকস নিষিদ্ধ হয়ে ছয় মাস মাঠের বাইরে কাটিয়েছেন। শঙ্কা ছিল কারাগারে যাওয়ারও। তখন মনে হচ্ছিল, স্টোকসের ক্যারিয়ারটাই বুঝি সেখানে থমকে যাবে। তবে সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলো পেরিয়ে ফাইনালে ৮৪ রানের অনবদ্য এক ইনিংস খেলে দলকে লড়াইয়ে টিকিয়ে রেখেছিলেন। এমনকি সুপার ওভারে ৮ রান নিয়েও দলকে এনে দিয়েছিলেন লড়াই করার মতো সংগ্রহ। সবচেয়ে চমকে দেওয়ার মতো ব্যাপার হলো, অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে যে নিউজিল্যান্ডকে স্টোকস কাঁদিয়েছেন, তার জন্ম সেই নিউজিল্যান্ডেরই ক্রাইস্টার্চে।

খালি হাতে ছিল না নিউজিলান্ডও। পুরো আসরে ৮১ গড়ে ৫৭৮ রান করে নিউজিল্যান্ডের দুর্বল ব্যাটিং লাইনআপকে বলতে গেলে একাই টেনে নিয়ে গেছেন তাদের অধিনায়ক কেইন উইলিয়ামসন। ব্যাট হাতে ছাড়াও নিঁখুত রণকৌশলে যেভাবে তিনি পুরো দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। তাই সব মিলিয়ে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছেন ক্রিকেটের এ ভদ্রলোক। কিন্তু দিনশেষে তো তিনি এক অর্থে ট্র্যাজিক হিরোই। ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে টানা দুবার বিশ্বকাপ ফাইনালে হেরেছে নিউজিল্যান্ড। টানা দুবার একদম নিঃশ্বাস দূরত্বে থেকেই বিশ্বকাপ ট্রফিটাকে না ছুঁয়ে শুধু দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। হয়তো এ কারণেই টুর্নামেন্ট সেরা হয়েও উইলিয়ামসনের মুখাবয়বেও ভর করেছিল হতাশার নিকষ কালো অন্ধকার।

কেইন উইলিয়ামসন

তবে যাই হোক না কেন ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালটি যেন টুর্নামেন্টের ইতিহাসে তো বটেই, ওয়ানডে ইতিহাসেরও তর্কসাপেক্ষে সেরা ম্যাচ। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে এমন ফাইনাল আগে দেখা যায়নি। দুই দলের নির্ধারিত ১০০ ওভারে ম্যাচ টাই হওয়ার পর সুপার ওভারেও টাই! এমন ফাইনালই তো ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে পরম আকাঙ্ক্ষিত। ম্যাচের শেষ বলটি হওয়ার পর মনে হবে, কোনো দলই তো হারেনি। বরং ক্রিকেট খেলাটাই আসল বিজয়ী। ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল শেষে ঠিক এমনটাই মনে হয়েছে। লো-স্কোরিং ম্যাচ কী পরিমাণ উত্তেজনার তৈরি করতে পারে, তার প্রমাণ সেই ফাইনালটিই। সর্বকালের অন্যতম সেরা ওয়ানডে ম্যাচ উপহার দেওয়ার পর সুপার ওভারেও যখন ম্যাচ টাই হলো, তখন দুই দলকে যুগ্মভাবে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করাই হয়তো সেরা ফলাফল হতো বলে ধারণা অনেকের। কিন্তু দিনশেষে সেই বিশ্বকাপের গল্পটা সুপার ওভার আর একটি ওভার থ্রোয়ের।

About

Popular Links