৫০ ওভারের ক্রিকেটের বিশ্বযজ্ঞে কেউ ব্যাট হাতে বোলারদের তুলোধনা করেন, তো আবার কেউ বল হাতে আগুন ঝরান। একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে ব্যাটারদের কঠিন পরীক্ষা নেওয়া বোলারদের সংখ্যাটা নেহাত কম না। তবে উইকেটের পর উইকেট ফেলে প্রতিপক্ষ দলের ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙে দেওয়া বোলারের সংখ্যাটা গুটিকয়েকই বটে।
চলুন জেনে নিই এখন পর্যন্ত আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি পাঁচ বোলারের কীর্তিগাঁথা-
গ্লেন ম্যাকগ্রা (অস্ট্রেলিয়া)
ক্রিকেট ইতিহাস তো বটেই, অস্ট্রেলিয়ার সর্বকালের সেরা বোলারের নাম নিলে গ্লেন ম্যাকগ্রার নামটা শুরুর দিকেই নিতে হবে। মিতব্যয়ী বোলিংয়ের পাশাপাশি দুর্দান্ত সুইং, লাইন ও লেংথে ব্যাটারদের বিপাকে ফেলে উইকেট তুলে নিতে এই অস্ট্রেলিয়ান পেসারের জুড়ি ছিল না। দেশে-বাইরের বিভিন্ন কন্ডিশনেও ম্যাকগ্রা ছিলেন একই রকম দুর্বার।
উপমহাদেশের মাটিতে ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে পা রাখেন ম্যাকগ্রা। সেই আসরে ৭ ম্যাচে মাঠে নেমে ৪৩ গড়ে ৬টি উইকেট নেন তিনি। এর মধ্যে ট্রান্স তাসমান প্রতিবেশী নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেমিফাইনালে দুটি করে উইকেট নেন এ পেসার। ফাইনালে টুর্নামেন্টের অন্যতম আয়োজক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ফাইনালে ম্যাকগ্রা ছিলেন উইকেটবিহীন, অস্ট্রেলিয়াও সন্তুষ্ট থাকে রানার্সআপ হিসেবেই।
আগের আসরের অপ্রাপ্তি ঘুচিয়ে দিতেই যেন ১৯৯৯ বিশ্বকাপে আসেন ম্যাকগ্রা। ১০ ম্যাচে ২০.৩৮ গড়ে ১৮ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে এক যুগ পর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে বড় অবদান রাখেন তিনি। গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো পাঁচ উইকেট শিকার করেন এ পেসার। সুপার সিক্সেও প্রথম ম্যাচেই ভারতের বিপক্ষে তিন উইকেট শিকার করেন এ অস্ট্রেলিয়ান। ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে নেন দুই উইকেট। ২০ উইকেট নিয়ে সতীর্থ শেন ওয়ার্ন যৌথভাবে সেই আসরের সফলতম বোলার হন। ম্যাকগ্রার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়।

২০০৩ সালে বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশন শুরুর আগেই বড় ধাক্কা খায় অস্ট্রেলিয়া। টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম ম্যাচের আগেরদিন ড্রাগ টেস্টে পজেটিভ হয় নিষিদ্ধ হন ওয়ার্ন। বোলিং আক্রমণের অন্যতম বড় অস্ত্রকে হারিয়েও পুরো আসরজুড়েই অস্ট্রেলিয়ানদের বোলিং ছিল তোপ দাগানো। পুল স্টেজে নামিবিয়ার বিপক্ষে মাত্র ১৫ রানের বিনিময়ে ৭ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ার সেরা ও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা বোলিং ফিগারের মালিক হন ম্যাকগ্রা। ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে সেই আসর ও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক শচীন টেন্ডুলকারসহ তিন ব্যাটারকে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা জেতানোয় ভূমিকা রাখেন ম্যাকগ্রা। পুরো টুর্নামেন্টে ১১ ম্যাচ খেলে ১৪.৭৬ বোলিং গড়ে ২১ উইকেট শিকার করলেও আসরের সফল বোলারের তালিকায় শ্রীলঙ্কার চামিন্দা ভাস (২৩) ও সতীর্থ ব্রেট লির (২২) পেছনেই থাকতে হয় তাকে।
দারুণ বোলিংয়ের পরও আগের দুই আসরে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারির তালিকায় কখনোই শীর্ষে থাকতে পারেননি ম্যাকগ্রা। তবে ২০০৭ বিশ্বকাপে সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে দেন তিনি। পুরো আসরে ১১ ম্যাচে মাত্র ১৩.৭৩ বোলিং গড়ে ২৬টি উইকেট নিয়ে সফল বোলার তো বটেই, টুর্নামেন্টেরই সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পান এ অজি পেসার। ম্যাকগ্রা সেবার কোনো ম্যাচেই চার/পাঁচ উইকেট শিকার করেননি বটে; কিন্তু ছয়টি ম্যাচে ন্যুনতম তিনটি করে উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে হ্যাটট্রিক শিরোপা জেতাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন তিনি।
ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপের চার আসরে ৩৯ ম্যাচে বল হাতে নিয়ে ৭১টি উইকেট নেন ম্যাকগ্রা। তবে এই কিংবদন্তি পেসারের মাহাত্ম্য এতেই বোঝা মুশকিল। ৫০ ওভারের ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে সর্বোচ্চ ৪২টি মেডেন ওভারের মালিক তিনি। রান খরচেও ম্যাকগ্রা ছিলেন অসম্ভব মাত্রার কৃপণ; বিশ্বকাপে তার বোলিং গড় ১৮.১৯, যার মধ্যে ওভারপ্রতি মাত্র ৩.৯৬ রান দিয়েছেন।
মুত্তিয়া মুরালিধরন (শ্রীলঙ্কা)
আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের সফল বোলারদের তালিকা করলেই দেখা যায় পেসারদের একচ্ছত্র রাজত্ব। কিন্তু মুত্তিয়া মুরালিধরন এখানে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। সবচেয়ে বড় মারণাস্ত্র দুসরা থেকে শুরু করে স্পিন বিষে ব্যাটারদের দুঃস্বপ্ন ছিলেন এ লঙ্কান স্পিনার।
উপমহাদেশে আয়োজিত ১৯৯৬ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ও একমাত্র শিরোপা জেতে শ্রীলঙ্কা। নিজের দেশকে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে ছয় ম্যাচ খেলে ৩০.৮৫ গড়ে সাত উইকেট শিকার করেছিলেন মুরালি। লঙ্কান বোলারদের মধ্যে আসরের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারিও ছিলেন তিনি।
১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপটি শ্রীলঙ্কার জন্য ভালো যায়নি। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নেমে লঙ্কানরা বিদায় নেয় গ্রুপপর্ব থেকেই। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নেওয়া তিন উইকেট ছাড়া বল হাতে তেমন কিছু করতে পারেননি মুরালি। পাঁচ ম্যাচে ২৬.৩৩ গড়ে ছয় উইকেট শিকার করেছিলেন এ অফ স্পিনার।
২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো আফ্রিকার মাটিতে আয়োজিত বিশ্বকাপে আগের দুই আসরের তুলনায় মুরালিধরনের পারফরম্যান্স ছিল বেশ ভালো। সেবার স্পিনারদের মধ্যে তার চেয়ে বেশি কেউ উইকেট নিতে পারেননি। কেনিয়ার বিপক্ষে চারটি আর বাংলাদেশ ও ভারতের বিপক্ষে তিনটিসহ পুরো আসরে দশ ম্যাচ খেলে ১৮.৭৬ গড়ে ১৭ উইকেট পেয়েছিলেন মুরালি।

২০০৭ বিশ্বকাপে মুরালিধরন যেন নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মিশনে নেমেছিলেন। পুরো টুর্নামেন্টে তার স্পিন বিষে নীল হন প্রতিপক্ষের ব্যাটাররা। গ্রুপপর্বে ভারত আর সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিনটি ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে চারটি করে উইকেট নেন মুরালি। তবে সেই আসরে মুরালির রুদ্রমূর্তি টের পেয়েছিল নিউজিল্যান্ড। কিউইদের বিপক্ষে সুপার এইটে তিনটি ও সেমিফাইনালে চারটি উইকেট শিকার করেন মুরালি। পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষ ফাইনালে অবশ্য মুরালি ছিলেন উইকেটশূন্য, ফলে শ্রীলঙ্কাকেও হতে হয় রানার্সআপ। তবে দশ ম্যাচে ১৫.২৬ গড়ে ২৩ উইকেট তুলে নিয়ে মুরালি নিজের ভূমিকায় সফলই ছিলেন।
ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে মুরালির শুরুটা যেমন হয়েছিল উপমহাদেশে, তেমনি তার সমাপ্তিও হয় সেখানেই। ২০১১ সালে নিজের খেলা শেষ বিশ্বকাপে অবশ্য আগের আসরের ফর্মটা টেনে আনতে পারেননি এ লঙ্কান স্পিনার। গ্রুপপর্বে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চারটি আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিনটি উইকেট ছাড়া কোনো ম্যাচে মুরালির আহামরি বোলিং পারফরম্যান্স নেই। ব্ল্যাক ক্যাপসদের বিপক্ষে সেমিফাইনালে অবশ্য তিনি দুই উইকেট নিয়েছিলেন। তবে ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে আগের আসরের মতোই উইকেটের দেখা পাননি মুরালি। ফলে নিজের শেষ বিশ্বকাপে নয় ম্যাচ খেলে ১৯.৪০ গড়ে ১৫ উইকেট শিকারেই থেমে যেতে হয় তাকে।
মুত্তিয়া মুরালিধরন ক্যারিয়ারে পাঁচবার বিশ্বকাপ খেলে ৪০ ম্যাচের মধ্যে ৩৯টিতে বল হাতে নিয়ে ১৯.৬ গড়ে ৬৮টি উইকেট নেন। যদিও এ কিংবদন্তি স্পিনার কখনো টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারির স্বীকৃতি বগলদাবা করতে পারেননি। কখনো ম্যাচে পাঁচ উইকেট না পেলেও ইনিংসে চার উইকেটের দেখা পেয়েছেন চারবার। স্পিনারদের মধ্যে আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ উইকেটের মালিকও তিনি। সামান্য এদিক-সেদিক হলে হয়ত ম্যাকগ্রার জায়গায় তার নামই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হিসেবে থাকত।
লাসিথ মালিঙ্গা (শ্রীলঙ্কা)
আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ শিকারির তালিকায় শীর্ষ পাঁচে মুরালিধরন ছাড়াও আরও এক শ্রীলঙ্কান হিসেবে আছেন লাসিথ মালিঙ্গা। তার মতো খুব কম বোলারই ব্যাটারদের হৃদয়ে কাঁপন ধরাতে পেরেছেন। এ লঙ্কান পেসারের হাত থেকে বেরোনো গোলায় ব্যাটারদের কুপোকাত হওয়া যেন বিশ্বকাপের নিয়মিত দৃশ্য ছিল।
২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে পা রাখেন মালিঙ্গা। দলে মুরালির মতো কিংবদন্তি থাকার পরও স্বীয় ভূমিকায় এ পেসার ছিলেন বেশ উজ্জ্বল। গ্রুপপর্বে বারমুডা ও বাংলাদেশের বিপক্ষে তিনটি করে উইকেট নিয়ে মালিঙ্গার বিশ্বকাপ অভিষেকটা ছিল দুর্দান্ত। সুপার এইটের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টানা চার বলে উইকেট নিয়ে হ্যাটট্রিক করেন তিনি। ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই উইকেট নিলেও দিনশেষে মালিঙ্গাকে থাকতে হয়েছিল পরাজিত দলেই। তবে ৮ ম্যাচে ১৫.৭৭ গড়ে ১৮ উইকেট নিয়ে অভিষেক বিশ্বকাপটা স্মরণীয় করে রাখেন তিনি।
উপমহাদেশের মাটিতে আয়োজিত ২০১১ বিশ্বকাপেও আগের আসরের ফর্মটা টেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মালিঙ্গা। গ্রুপপর্বে কেনিয়ার বিপক্ষে ৩৮ রানের খরচায় ৬ উইকেট নেন এ লঙ্কান পেসার। কেনিয়ানদের বিপক্ষে সেই ম্যাচে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করেন মালিঙ্গা। যদিও বাকি আসরে বলার মতো তেমন কিছু করতে পারেননি তিনি। ফাইনালে অন্যতম সহআয়োজক ভারতের বিপক্ষে ২ উইকেট নিলেও লঙ্কান পেসারকে পুরোনো পরিণতিই বরণ করতে হয়। ওই আসরে ৭ ম্যাচে বল হাতে ২০.৭৬ গড়ে ১৩টি উইকেট নেন মালিঙ্গা।

ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ আর উপমহাদেশের পর বিশ্বকাপের আসর বসে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে। জায়গা বদলালেও মালিঙ্গার রুদ্রমূর্তিতে পরিবর্তন আসেনি। গ্রুপপর্বে আফগানিস্তান আর বাংলাদেশের বিপক্ষে ৩টি ও অস্ট্রেলিয়া আর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি করে উইকেট নেন লঙ্কান গতিদানব। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হেরে যাওয়ায় দ্বীপরাষ্ট্রটির দৌড় থেমে যায় কোয়ার্টার ফাইনালেই। ওই ম্যাচেও দলের পক্ষে একমাত্র উইকেট নেন মালিঙ্গাই। তাসমান সাগরের তীরে আয়োজিত সেই আসরে ৭ ম্যাচ খেলে ২৯.৫০ গড়ে ১২টি উইকেট শিকার করেন এ লঙ্কান বোলার।
ক্রিকেটের আদিভূমি ইংল্যান্ডে আয়োজিত ২০১৯ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কা লিগ পর্ব পেরোতে ব্যর্থ হয়। তবে স্বাগতিক ও সেই আসরে শিরোপা জেতা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চারটি আর আফগানিস্তান এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিনটি করে উইকেট নিয়ে ভঙ্গুর শ্রীলঙ্কা দলে মালিঙ্গা ছিলেন স্বমহিমায় উজ্জ্বল। সেই আসরে ৭ ম্যাচে ২৮.৬৯ গড়ে ১৩টি উইকেট নেন লঙ্কান ফাস্ট বোলার।
নিজের ক্যারিয়ারে খেলা চার বিশ্বকাপে মালিঙ্গা সব মিলিয়ে মাত্র ২৯ ম্যাচ খেলেই ২২.৮৮ গড়ে ৫.৫১ ইকোনমি রেটে ৫৬ উইকেট শিকার করেছেন মালিঙ্গা। তুলনামূলক কম ম্যাচেই বল হাতে নিলেও তার উইকেটবিহীন থাকান ঘটনা বিরল। বিশ্বকাপ ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুটি হ্যাটট্রিকের কীর্তি আছে শুধু তারই। বিশ্বকাপের মঞ্চে বোলারদের মধ্যে মালিঙ্গার চেয়ে দ্রুত কেউ উইকেট শিকারের হাফ সেঞ্চুরি করতে পারেননি।
ওয়াসিম আকরাম (পাকিস্তান)
যুগে যুগে দুর্দান্ত ফাস্ট বোলার জন্ম দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের সবসময়ই আলাদা সুনাম ছিল। তবে ওয়াসিম আকরামের মতো খুব কম পেসারই ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় একই রকম ছন্দে ছিলেন। বিশেষ করে ওয়াসিমের বাম হাত থেকে ছুঁড়ে দেওয়া ইনসুইঙ্গার ছিল ব্যাটারদের জন্য নিশ্চিত মৃত্যুফাঁদ।
বিশ্বকাপের প্রথম তিন আসর ইংল্যান্ডে আয়োজিত হয়। ১৯৮৭ সালে প্রথমবারের মতো উপমহাদেশের মাটিতে বসে ওয়ানডে ক্রিকেটের বিশ্বযজ্ঞ। ওই আসরে গ্রুপপর্বে দুবার করে ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের মু্খোমুখি হয় পাকিস্তান। ইংলিশদে বিপক্ষে ওয়াসিম আকরাম কোনো উইকেটের দেখা পাননি। তবে বাকি দুই দলের বিপক্ষেই একাধিকবার উইকেট তুলে নিতে সক্ষম হন তিনি। যদিও সেবারের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাকিস্তানের হেরে যাওয়া সেমিফাইনালে ওয়াসিম আকরাম ছিলেন উইকেটশূন্য। নিজের অভিষেক বিশ্বকাপে সাত ম্যাচে ৪২.১৪ গড়ে সাত উইকেট নেন এ ফাস্ট বোলার।
১৯৯২ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপে ওয়াসিম আকরাম ছিলেন রীতিমত বিধ্বংসী। রাউন্ড রবিন ফরম্যাটের গ্রুপপর্বে ১৩টি উইকেট শিকার করেন এ পাকিস্তানি বোলার। এর মধ্যে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪টি, জিম্বাবুয়ে ৩টি আর দক্ষিণ আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তিনি ২টি উইকেট নেন। গ্রুপপর্বের ফর্মটা নকআউট পর্বেও ঠিকই টেনে নেন ওয়াসিম। শেষ চারে কিউইদের বিপক্ষে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ে ২টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নেন তিনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে ৩ উইকেট নিয়ে তো ওয়াসিম আকরাম জয়েরই নায়ক। সেই আসরে ১৮ উইকেট শিকার করে ওয়াসিম আকরাম ছিলেন টুর্নামেন্টের সফলতম বোলার। ফাইনালে ইংলিশদের তিন উইকেট তুলে নেওয়ার আগে ব্যাট হাতে ১৮ বলে ৩৩ রান করে পাকিস্তানকে প্রথম বিশ্বকাপ জেতানো ওয়াসিম ছিলেন ম্যাচসেরাও।

আগের আসরটা স্বপ্নের মতো কাটলেও ১৯৯৬ বিশ্বকাপটা ওয়াসিম আকরামের জন্য ভুলে যাওয়ার মতো উপলক্ষই ছিল। গ্রুপপর্বের পাঁচ ম্যাচে ওয়াসিম নিয়েছিলেন মাত্র তিন উইকেট। তবে সেই ক্ষতির অনেকটাই ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডে আয়োজিত পরের আসরে পুষিয়ে দিয়েছিলেন এ পাকিস্তানি পেসার। গ্রুপপর্বে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩টি ও সেই আসরের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন ওয়াসিম। সুপার সিক্সে ভারত আর সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুই উইকেট শিকার বাদে বাকি টুর্নামেন্টে অবশ্য তিনি আর বলার মতো কিছু করতে পারেননি। ফাইনালে নেওয়া এক উইকেটসহ পুরো আসরে দশ ম্যাচে ২২.৮০ গড়ে ১৫ উইকেট তুলে নিয়েছিলেন এ পাকিস্তানি পেসার।
আগের আসরের ফাইনালিস্ট পাকিস্তান ২০০৩ বিশ্বকাপে পুল স্টেজই পেরোতে পারেনি। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে দাঁড়ানো ওয়াসিম আকরামও ছিলেন নিজের ছায়া। তবে এর মাঝেও এই পাকিস্তানি ফাস্ট বোলার নিজের ঝলক দেখাতে ভোলেননি। অস্ট্রেলিয়া আর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তিনটি করে উইকেট নেন। তবে নামিবিয়ার বিপক্ষে মাত্র ২৮ রানের বিনিময়ে তিনি পাঁচ উইকেট শিকার করেছিলেন তিনি, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে তার সেরা বোলিং ফিগার। নিজের শেষ বিশ্বকাপে ছয় ম্যাচ খেলে পাঁচ ইনিংসে বল করে ১৬.৭৫ গড়ে ১২ উইকেট নিয়েছিলেন ওয়াসিম আকরাম।
আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের ইতিহাসে পাঁচ আসরে খেলা বিরলতম ক্রিকেটারদের একজন হলেন ওয়াসিম আকরাম। বিশ্বকাপে ৩৮ ম্যাচে ২৩.৮৩ বোলিং গড়ে ৫৫ উইকেট শিকার করেছিলেন এ কিংবদন্তি পেসার। তিনি ইনিংসে পাঁচ উইকেট একবার এবং চার উইকেট দুইবার শিকার করেছিলেন। যদিও বিশ্বকাপের মঞ্চে তার পারফরম্যান্স ওঠানামার মধ্যেই ছিল। তবে নিজের দিনে যে তার চেয়ে বিধ্বংসী আর কেউ নেই, সেটা এ পাকিস্তানি ফাস্ট বোলার দেখিয়েছেন অনেকবারই।
মিচেল স্টার্ক (অস্ট্রেলিয়া)
আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের সফলতম বোলারদের তালিকার শীর্ষ পাঁচের শুরুটা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি এক পেসারকে দিয়ে। তালিকার শেষটা হবে আরেক অস্ট্রেলিয়ান পেসার মিচেল স্টার্ককে দিয়ে। বর্তমানে খেলছেন, এমন খেলোয়াড়দের মধ্যে এই তালিকায় একমাত্র তিনিই আছেন।
২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপে স্টার্কের সামনে কোনো ব্যাটারই স্বস্তিতে ছিল না। গ্রুপপর্বে ইংল্যান্ড-আফগানিস্তান-শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুটি ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৪টি উইকেট নেন তিনি। তবে টুর্নামেন্টের অন্যতম সহ-আয়োজক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ২৮ রানের বিনিময়ে ৬ উইকেট নেন স্টার্ক।
গ্রুপপর্বের মতো নকআউট পর্বেও এই অস্ট্রেলিয়ান পেসার ছিলেন স্বরূপে। পাকিস্তানের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল, ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ও ব্ল্যাক ক্যাপসদের বিপক্ষে ফাইনালে দুটি করে উইকেট নেন তিনি। নিউজিল্যান্ডের পেসার ট্রেন্ট বোল্টের (৯) সমান ২২ উইকেট পেলেও তার চেয়ে কম ম্যাচ (৮) খেলায় ও শ্রেয়তর ইকোনমি রেট থাকায় অভিষেক বিশ্বকাপেই সফলতম বোলার ছিলেন স্টার্কই। সেই সঙ্গে আসরের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে অস্ট্রেলিয়াকে পঞ্চম ও শেষবারের মতো বিশ্বকাপ জেতাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন এই ফাস্ট বোলার।

ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় ২০১৯ বিশ্বকাপে যেন নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে আসেন স্টার্ক। লিগ পর্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫টি ও শ্রীলঙ্কা-ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪টি উইকেট নেন এ বাঁহাতি বোলার। সেবারের চ্যাম্পিয়ন ইংলিশদের বিপক্ষে হেরে যাওয়া সেমিফাইনালে অবশ্য স্টার্ক নিয়েছিলেন মাত্র একটি উইকেট। তবে ১০ ম্যাচে ১৮.৫৯ গড়ে ২৭ উইকেট নিয়ে এ অজি পেসারই টানা দ্বিতীয়বারের মতো টুর্নামেন্টের সফল বোলারের স্বীকৃতি পান।
ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত মাত্র দুবার বিশ্বকাপ খেলেছেন স্টার্ক। তবে মাত্র ১৮ ম্যাচেই মাত্র ১৪.৮২ গড়ে ৪৯ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টের ইতিহাসের সফলতম বোলারের তালিকায় শীর্ষ পাঁচে জায়গা পেতে তার জন্য সেটাই যথেষ্ট ছিল। বিশ্বকাপ ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে টানা দুই আসরে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হওয়ার কীর্তিও আছে শুধু স্টার্কেরই। মালিঙ্গাকে হটিয়ে আসন্ন বিশ্বকাপেই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে দ্রুততম সময়ে উইকেটের হাফ সেঞ্চুরি করার হাতছানিও আছে ৩৩ বছর বয়সী এ অস্ট্রেলিয়ানের সামনে।



