রেফারি শেষের বাঁশি বাজাতেই রেড বুল আরেনার সবুজ গালিচায় একে একে শুয়ে পড়লেন দুই পক্ষের ফুটবলাররা। সবাই কাঁদছেন; সবার অভিব্যক্তিতেই অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। এক পক্ষ কাঁদছে কীভাবে শেষ ষোলো নিশ্চিত হলো- এই আনন্দে, অন্যপক্ষ কাঁদছে টুর্নামেন্ট থেকে যে প্রায় ছিটকে গেছে, তা হজম করতে কষ্ট হওয়ায়।
ইউরোয় “বি” গ্রুপের তৃতীয় রাউন্ডে ইতালি-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের শেষ দৃশ্য এটি। নির্ধারিত সময় শেষে অতিরিক্ত ৮ মিনিট খেলার সুযোগ দেন রেফারি। এর প্রায় সবটুকু সময় ইতালিকে চেপে ধরে রেখে জয় উদযাপনের জন্য প্রস্তুত ক্রোয়েশিয়ার খেলোয়াড়-স্টাফদের সবাই। কিন্তু শেষ মিনিটে কোথা থেকে এক নীল ঝড় এসে সে সব আয়োজন মাটি করে দিল, আর বেদনার নীল স্রোতে ভেসে গেল ক্রোয়েশিয়া।
শেষ ষোলো নিশ্চিত করতে জিততেই হবে- এমন কঠিন সমীকরণ সামনে রেখে সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালির মুখোমুখি হয় লুকা মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়া। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে কাঙ্ক্ষিত গোলও পেয়ে যায় তারা। এরপর আক্রমণাত্মক ফুটবল থেকে বেরিয়ে রক্ষণে ঝলক দেখাতে থাকে ক্রোয়াটরা। টানা ৪৩ মিনিট কৌশল, দক্ষতা আর মনস্তত্ত্বের লড়াই এগিয়েই ছিল তারা। কিন্তু শেষ মুহূর্তের একটু বেখেয়ালে পা হড়কে গেল, আর হতাশার অতল গহ্বরে তলিয়ে গেল ২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনালিস্টরা।
এই ম্যাচে ড্র করেও তিন ম্যাচে চার পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে থেকে শেষ ষোলোয় উঠেছে ইতালি। তৃতীয় দলের সুযোগ থাকলেও দুই পয়েন্ট নিয়ে আরও তিন দলকে টক্কর দেওয়া একপ্রকার অসম্ভব ক্রোয়েশিয়ার। ফলে ইউরোপ সেরার এবারের আসর থেকে তাদের বিদায় শুধু সময়ের অপেক্ষা।
তৃতীয় ম্যাচে ইভান পেরিসিচকে বসিয়ে লুকা সুশিচকে আক্রমণভাগে নামান ক্রোয়েশিয়া কোচ জ্লাতকো দালিচ।
শুরু থেকেই এমনভাবে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় ক্রোয়েশিয়া যে প্রথম দুই মিনিটে বলে স্পর্শই করতে পারেনি ইতালি। চতুর্থ মিনিটে দারুণ এক গোলের সুযোগও তৈরি হয় তাদের। বক্সের বাইরে থেকে দারুণ এক বাঁকানো শট দেন রাইট উইঙ্গার সুশিচ। কিন্তু তার চেয়েও অসাধারণ দক্ষতায় ঝাঁপিয়ে বলটি বাইরে বের করেন দেন ইতালির গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মা।
প্রথম ৭ মিনিট ম্যাচে একক আধিপত্য বিস্তার করে ক্রোয়েশিয়া। এ সময় ৯০%৳ সময় তাদের দখলে ছিল বল। তবে অষ্টম মিনিটে প্রথম আক্রমণে যায় ইতালি। লরেন্সো পেলেগ্রিনির পাস ধরে ডান দিকে দিয়ে উঠে যান জিওভান্নি দি লরেন্সো। তবে ডি বক্সের মধ্যে ক্রস দিলে ইয়োস্কো গেভারদিওলের কাছে প্রতিহত তাদের সে আক্রমণটি।
ম্যাচের ত্রয়োদশ মিনিটে গ্রুপের অন্য ম্যাচে গোল পেয়ে যায় স্পেন। ফলে তা সুখবর নিয়ে আসে ক্রোয়েশিয়ার জন্য। স্পেনের গোলে এক পয়েন্ট নিয়ে চারে নেমে যায় আলবেনিয়া, আর তিনে উঠে আসে ক্রোয়েশিয়া। ২১তম মিনিটে ইতালির আরও একটি সুযোগ নষ্ট হয়। বাঁ দিক থেকে ডিফেন্ডার রিকার্দো কালাফিওরি বল নিয়ে এসে ফরওয়ার্ড মাতেও রেতেগিকে ক্রস দেন। তবে রেতেগির হেডারটি গোলপোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায়।
২৭তম মিনিটে আলেসান্দ্রো বাস্তোনির বক্সের ভেতর থেকে নেওয়া জোরালো শট অবিশ্বাস্যভাবে ঠেকিয়ে দেন ক্রোয়াট গোলরক্ষক ডমিনিক লিভাকোভিচ। ফলে নিশ্চিত গোল হাতছাড়া হয় ইতালির। ৩৫তম মিনিটে ইতালির আরও একটি শট ঠেকিয়ে দেন তিনি।
এর পরের দশ মিনিট দুই দলই ধীরগতির ফুটবল খেলতে থাকলে বল মাঝমাঠেই ঘোরাফেরা করে। ফলে গোল ছাড়াই বিরতিতে যায় দুদল।
দ্বিতীয়ার্ধে খেলতে নেমে শুরু থেকে দুই দলই গোল পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। তবে প্রথম সুযোগটি আসে ক্রোয়েশিয়ার। বক্সের মধ্যে থেকে তাদের এক খেলোয়াড় দূরের পোস্টে বাঁকানো শট নিলে তা হাতে লাগে বিরতির সময় পেলেগ্রিনির বদলি নামা দাভিদ ফ্রাত্তেসির। রিভিউ দেখে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি, কিন্তু লুকা মদ্রিচের পেনাল্টি শট ঠেকিয়ে দেন দোন্নারুম্মা।
তবে এর পরের মিনিটেই গোল পেয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া, আর খলনায়ক থেকে নায়ক বনে যান মদ্রিচ।
দোন্নারুমা পেনাল্টি শটটি ঠেকিয়ে দিলে তা ডান দিকে চলে যায়। পেনাল্টি ঠেকিয়ে দোন্নারুম্মা যখন উদযাপন করছেন, এরইমধ্যে বল ধরে এগিয়ে এসে শট নেন ক্রোয়েশিয়ার আন্তে বুদিমির। সেই শটটিও ফিরিয়ে দিলে ছয় গজ বক্সের সামান্য বাইরে পেয়ে যান মদ্রিচ। বল গন্তব্যে পাঠাতে এবার আর ভুল হয় না তার। ফলে ম্যাচে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। ইতালিকে তিনে ঠেলে পয়েন্ট টেবিলের দুইয়ে উঠে আসে তারা।
এর কিছুক্ষণ পরই দারুণ আক্রমণ শানায় ইতালি। তবে ক্রোয়াট ডিফেন্সে কাটা পড়ে তা কর্নার হয়। এরপর লাফিয়ে উঠে মুষ্টি দিয়ে কর্নার কিক থেকে আসা ক্রস ক্লিয়ার করেন লিভাকোভিচ। এ সময় আক্রমণ ছেড়ে রক্ষণ সামলাতে বেশি মনোযোগী হতে দেখা যায় ক্রোয়েশিয়াকে। আর চেপে ধরার এই সুযোগ লুফে নেয় ইতালি। অবশ্য মাঝেমধ্যেই পাল্টা আক্রমণে গিয়ে ব্যবধান বাড়ানোর চেষ্টা করছিল দালিচের শিষ্যরা।
৬১তম মিনিটে কিয়েসার দূরের শট প্রতিহত করে কর্নার বানায় ক্রোয়েশিয়া। এসময় কর্নার থেকে গোল পেয়েই যাচ্ছিল ইতালি। তবে বাস্তোনির হেডার গোলপোস্টের সামান্য ওপর দিয়ে চলে যায়।
৬৫তম মিনিটে কিয়েসার শট থেকে ফের কর্নার আদায় করে ইতালি। এবারও ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণ দেওয়ালে কাটা পড়ে তাদের প্রচেষ্টা। পরের মিনিটে ফের বল নিয়ে ক্রোয়াটদের বক্সে ঢুকে পড়ে লুসিয়ানো স্পালেত্তির শিষ্যরা। সেটিও ক্রোয়েশিয়ার রক্ষেণে প্রতিহত হয়। ৬৭তম মিনিটে ইতালির আরেকটি আক্রমণ ক্রোয়াট রক্ষণে প্রতিহত হয়, ৬৮তম মিনিটে ফের আরেকটি। এবার কর্নার পায় ইতালি, সেটি লিভাকোভিচ ক্লিয়ার করলে আবারও পরপর দুটি দারুণ আক্রমণে গিয়ে ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণ কাঁপিয়ে দেয় নীল জার্সিধারীরা।
আক্রমণের সুযোগ পেয়ে অনবরত নিজেদের সামর্থ্যের পরীক্ষা করতে থাকে ইতালি। অপরদিকে, দারুণ মনোযোগী রক্ষণে মাথা ঠান্ডা রেখে ইতালির ক্রমাগত আক্রমণের হলকা ঠেকিয়ে দিতে থাকে ক্রোয়েশিয়া। ৭১তম মিনিটে গেভারদিওলের ফাউলে বক্সের কিছুটা বাইরে ফ্রি কিক পায় ইতালি। তবে জিয়াকমো রাসপেদরির শট রক্ষণ দেওয়ালে ঠেকে কর্নার হয়ে যায়। কর্নার থেকেও গোলের সুযোগ তৈরিতে ব্যর্থ হয় ইতালি।
এরপর মাঝমাঠে বল দখলের লড়াইয়ে কেটে যায় বেশ কিছুক্ষণ। তবে ম্যাচের ১১ মিনিট বাকি থাকতে ফের খেলায় ফেরে ক্রোয়েশিয়া। বল দখল ও আক্রমণ তৈরিতে মনোযোগী হয় তারা। ফলে ইতালির আক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। আরেকটি গোল খেলেই যে সব শেষ, তা বুঝেই সাবধানী ফুটবল খেলা শুরু করে তারা।
৮৪তম মিনিটে ক্রোয়েশিয়ার একটি ভালো আক্রমণ নিষ্ক্রিয় করে দেন কালাফিওরি। পরের মিনিটে তাদের আরও দুটি আক্রমণ প্রতিহত হয়।
ম্যাচের যখন আর মাত্র চার মিনিট বাকি, তখন ফের আক্রমণে যায় ইতালি, কিন্তু ক্ষুরধার আক্রমণের ধারেকাছেও ছিল না তারা। তবে ৮৭তম মিনিটে হঠাৎ গোল করার মতো সুযোগ আসে তাদের। ডান দিক থেকে হঠাৎ ছয় গজ বক্সের মধ্যে নিচু ক্রস বাড়ালে তাতে ইতালির কোনো খেলোয়াড় পা ছোঁয়াতে না পারেলে আবারও হতাশ হতে হয়।
নব্বই মিনিট পার হলেই আবার খেলায় ফেরে ক্রোয়েশিয়া। এসময় পুরো আট মিনিট ধরে চলে মনস্তত্ত্ব আর স্নায়ুর লড়াই। এ লড়াইয়ে ইতালির ফুটবলারদের দিশেহারা করে দিতে থাকে ক্রোয়াটরা।
কখন কীভাবে খেলার রাশ টেনে ধরতে হবে, কখন আক্রমণে গিয়ে প্রতিপক্ষকে ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে দিতে হবে, আর কখন কীভাবে সময় নষ্ট করতে হবে, পেশাদার ফুটবলের এসব শৈলীতে সমর্থকদের মুগ্ধ করে দেয় তারা। অন্যদিকে, শেষ সময়ে খেলার গতি বাড়াতে চেয়েও তা না পেরে বারবার ধৈর্য্য হারাতে থাকে ইতালির খেলোয়াড়রা। ফলে ফাউলের বাঁশি আর হলুদ কাড বের করতে করতে বিরক্ত হয়ে যান রেফারি।
এভাবে চলতে চলতে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ের শেষ মিনিটে। আর তক্ষুণি আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যা ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলার ও সমর্থকদের বেশ কিছুদিন রাতের ঘুম হারাম করবে।
শেষ মিনিটের শুরুতে একটি কর্নার পায় ক্রোয়েশিয়া। তা থেকে ভালো একটি ক্রসও আসে ইতালির ডি বক্সে, কিন্তু নিম্নমানের ফিনিশিংয়ে প্রতিপক্ষ বল ধরে ফেলে। এরপর দুটি লম্বা লম্বা পাসে মাঝমাঠের দিকে চলে যায় ইতালি। সেখান থেকে বল নিয়ে মরণ দৌড় দেন কালাফিওরি। তাকে সঙ্গ দিতে দিতে বাঁ পাশ ধরে এগোতে থাকেন উইং ব্যাক মাত্তিয়া সাক্কায়নি। মাঝমাঠ পার করেই জোরালে পাসে সাক্কায়নির কিছুটা সামনে বল বাড়ান কালাফিওরি। তিনি দৌড়ে গিয়ে তা ধরে একটু এগিয়েই ডি বক্সের বাইরের কোণা থেকে দূরের পোস্টে শটটি বাঁকিয়ে দেন। আর উড়ন্ত লিভাকোভিচকে ফাঁকি দিয়ে বল জালে জড়িয়ে যায়।
দুর্দান্ত গতিতে দৌড়ানো কালাফিওরি ও সাক্কায়নির দৌড় তখনও থামেনি। তারা তখন ছুটছেন গ্যালারির নীল ঢেউয়ের দিকে। আর তাদের পিছু নিয়েছেন সতীর্থ আর স্টাফরা। অভাবনীয় এক অধ্যায় রচনা করে শেষ ষোলোতে উঠে যায় ইতালি।
উদযাপন শেষ হওয়ার পর বলে প্রথম স্পর্শ করলেই শেষের বাঁশি বাজিয়ে দেন রেফারি। আর টিকে থাকার স্বস্তিতে যে যেখানে ছিলেন, বসে-শুয়ে পড়েন ইতালির খেলেয়াড়রা।
এ জয়ের পর নকআউট পর্বে আগামী ২৯ জুন সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবে ইতালি। আর ইংল্যান্ড-স্লোভেনিয়া ম্যাচের ওপর ঝুলে গেছে ক্রোয়েশিয়ার ভাগ্য। মঙ্গলবার ইংলিশরা যদি স্লোভেনিয়াকে কমপক্ষে তিন গোলের ব্যবধানে হারাতে পারে, তবে ক্রোয়েশিয়ার নকআউট আশা বেঁচে থাকবে।
অন্যদিকে, দিনের অপর ম্যাচে আলবেনিয়াকে ১-০ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে তিন জয়ে ‘পারফেক্ট’ গ্রুপ পর্ব শেষ করেছে স্পেন। হারে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেছে আলবেনিয়া। আগামী ৩০ জুন “এ”, “ডি”, “ই” ও “এফ” গ্রুপের সেরা তৃতীয় দলের মোকাবিলায় মাঠে নামবে “বদলে যাওয়া” স্পেন।



