একসময় ঈদের ছুটি মানেই ছিল নতুন জামা পরে আত্মীয়ের বাসায় ঘুরে বেড়ানো, বিকেলে পার্কের ভিড়ে আড্ডা কিংবা সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে শহুরে তরুণ প্রজন্মদের ঈদ উদযাপনের ধরন। এখন অনেক তরুণ-তরুণীর কাছে ঈদের ছুটির অন্যতম বড় আকর্ষণ ‘ক্যাফে হপিং’।
উৎসবের দিনগুলোতে কোনো একটি নির্দিষ্ট রেস্তোরাঁয় দীর্ঘ সময় ঠায় বসে না থেকে, একই দিনে বন্ধুরা মিলে একের পর এক নান্দনিক সব ক্যাফেতে ঘুরে বেড়ানোর এই নতুন সংস্কৃতি এখন বেশ তুঙ্গে।
ধানমন্ডি, বনানী, গুলশান কিংবা খিলগাঁওয়ের মতো ক্যাফে হাবগুলোতে ঈদের দিন বিকেল থেকেই মুখরিত থাকে তরুণদের উপচে পড়া পদচারণায়। নতুন পোশাকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, কফি, ডেজার্ট আর ছবি তোলাতেই কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। জেনজিদের এর এই চেনা আড্ডার আধুনিক রূপান্তর ও লাইফস্টাইল ট্রেন্ডের পেছনের গল্পগুলো জেনে নেওয়া যাক।
সুন্দর ফ্রেমের খোঁজ: ভিন্টেজ বনাম মিনিমালিস্টিক
বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম ও টিকটককেন্দ্রিক এই সংস্কৃতিতে এখনকার ক্যাফেগুলোর ইন্টেরিয়র ডিজাইন, লাইটিং ও বিশেষ ‘ফটো কর্নার’ বড় ভূমিকা রাখছে। ঈদের দিনে তরুণেরা তাদের সুন্দর পোশাকের সাথে মিলিয়ে ছবি তোলার জন্য নান্দনিক ব্যাকগ্রাউন্ড খোঁজেন। যেমন - ধানমন্ডির ‘টেরাকোটা’ বা ‘ক্যাফে ট্রাইপড’এর পুরোনো দিনের আবহ বা ভিন্টেজ লুকে ছবি তোলার পর, তারা হয়তো পরের ঘণ্টাতেই চলে যাচ্ছেন বনানীর ‘নর্থ এন্ড’ বা ‘ক্রিমসন অ্যান্ড ক্লোভার’ এর ছিমছাম আধুনিক পরিবেশে। শুধু খাবার নয়, কোথায় ভালো রিলস বানানো যাবে - সেটিও এখন তরুণদের বড় বিবেচনায় থাকছে।
কোল্ড ব্রু থেকে চিযকেক
খাদ্যরসিকদের কাছে ক্যাফে হপিংয়ের আসল মজা হলো খাবারের বৈচিত্র্য। কোনো ক্যাফে হয়তো বিখ্যাত তাদের সিগনেচার কফির জন্য, আবার অন্য কোনো ক্যাফের ডেজার্ট হয়তো শহরের সেরা। ঈদের আড্ডায় স্বাদের ভিন্নতা আনতে তরুণেরা এখন সব খাবার এক জায়গায় না খেয়ে ভাগ করে নেন। আড্ডা হয়তো শুরু হলো ‘কফি ক্লাব’ বা ‘তহবাজার’-এর এক কাপ কোল্ড ব্রু বা ক্যাপুচিনো দিয়ে, মেইন কোর্স খাওয়া হলো অন্য কোনো রুফটপ ক্যাফেতে, আর আড্ডার শেষ ভাগে মুখ মিষ্টি করতে তারা চলে যাচ্ছেন ‘গ্লেজড’ এর মতো কোনো ডেজার্ট শপে। অনেকেই আগে থেকেই তালিকা করে রাখেন কোন কোন ক্যাফেতে যাবেন আর কোন জায়গার খাবার এখন ট্রেন্ডে।
কড়া রোদ এড়িয়ে এসি রুমে স্বস্তির আড্ডা
ঈদের এই সময়ে গরমে খোলা আকাশের নিচে বা পার্কে দীর্ঘক্ষণ ঘুরে বেড়ানো বেশ অস্বস্তিকর। ঘাম আর কড়া রোদে ঈদের বিশেষ সাজ নষ্ট হওয়া বা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। এই কারণে পার্কের ধুলোবালি এড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ প্রজন্ম এখন ইনডোর বিনোদনের দিকে ঝুঁকছে। খিলগাঁওয়ের ‘ক্যাফে চেরি ড্রপস’ বা গুলশানের ‘গ্লোরিয়া জিন্স’এর মতো ঠাণ্ডা ও আরামদায়ক এসি লাউঞ্জে বসে বন্ধুদের সাথে গল্প করাটাই এই গরমে সবচেয়ে স্বস্তির। গ্রাহক টানতে ক্যাফে মালিকরাও এই সময়ে বিশেষ সাজসজ্জা, লাইভ মিউজিক কিংবা নতুন মেন্যু যোগ করে থাকেন।
ব্যস্ত জীবনে বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ এমনিতেই কমে গেছে। তাই ঈদের ছুটিতেই তারা আড্ডা, ঘোরাঘুরি আর নিজেকে প্রকাশের এই নতুন মাধ্যমটিকে বেছে নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে, ঈদের আনন্দ এখন শুধু পরিবারকেন্দ্রিক নয়; তরুণ প্রজন্মের কাছে সেটি হয়ে উঠছে বন্ধুত্ব, স্টাইল আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেন্দ্রিক এক নতুন শহুরে অভিজ্ঞতা।



