Saturday, October 24, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ঐতিহ্যবাহী ‘বউমেলা’ এখন শুধু নামেই, সময়ের বিবর্তনে রূপ নিয়েছে মিলনমেলায়

একসময় এ মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়া

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৩ এএম

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে সাঁওতাল আদিবাসীদের যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী মেলা এবারও বসেছে। কোনো প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই প্রতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরের দিন বাসিয়া হাটিতে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। একসময় এ মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়া, আর সে কারণেই দীর্ঘদিন ধরে এটি “বউমেলা” নামে পরিচিত। তবে সময়ের বিবর্তনে এখন আর সেই প্রথা নেই, মেলাটি রূপ নিয়েছে মিলনমেলায়।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির আয়োজনে এ মেলা বসে। সকাল থেকেই প্রচলিত রীতি অনুযায়ী রকমারি সাজে বাড়ির বড়দের সঙ্গে মেলায় আসেন সাঁওতাল তরুণ-তরুণীরা। ভিড় বাড়তে থাকলেও মূল মেলা জমে ওঠে বিকেল ৩টার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন বীরগঞ্জ থানা পুলিশের নেতৃত্বে আনসার ও গ্রামপুলিশ সদস্যরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন বয়সী মানুষের পাশাপাশি হিন্দু, মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে মেলা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কাচের চুড়ি, রঙিন ফিতা, লিপস্টিক, কানের দুল, ঝিনুকের মালা, মাটির খেলনা, দা, কুড়াল, হাঁড়ি-পাতিলসহ নানা পণ্য ও খাবারের দোকান নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে আসা দোকানিরা বেচাকেনায় ব্যস্ত সময় পার করেন। বাজনার তালে তালে চলে ঐতিহ্যবাহী নাচ-গানের আসর। ফুলের সাজে ও রঙিন পোশাকে সেজে আসা সাঁওতাল তরুণীরা ছিলেন সবার নজর কাড়ার মতো।

বিকেলে আয়োজক কমিটির সভাপতি জোসেফ হেমরমের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা হয়। এতে বক্তব্য দেন বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমা খাতুন, দিনাজপুর জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও চেম্বার অফ কমার্সের পরিচালক রেজওয়ানুল ইসলাম রিজু, পৌর বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব মো. আমিরুল বাহার, আয়োজক কমিটির উপদেষ্টা ও নিজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিস, মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিনুর রহমান চৌধুরী শাহিন এবং বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী নেতা শীতল মার্ডী।

জোসেফ হেমরম বলেন, “কেউ বলে ২০০ বছরের বেশি, আবার কেউ বলে অনেক দিন ধরে এ মেলা চলছে। মেলাটি কবে শুরু হয়েছে, তা কেউ বলতে পারে না। একসময় জীবনসঙ্গী খোঁজার কারণে এর নাম বউমেলা হলেও আধুনিক যুগের প্রভাবে এখন আর সেই প্রথা এখানে নেই। তা এখন শুধু মিডিয়া ও ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সন্তানেরা শিক্ষিত হচ্ছে, তারা এখন সামাজিকভাবেই চলে। তাই দীর্ঘদিন ধরে বিজয়া দশমীর পরের দিন আমরা দূরদূরান্তের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করি, আর এভাবেই মেলাটি মিলনমেলার রূপ নিয়েছে।”

আনিসুর রহমান আনিস বলেন, “আগে কঠিন সামাজিক বিধিবিধান থাকলেও এখন অনেকেই রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি মেনে বিয়ে করছেন। আগের মতো কোনো ঘটনাও এখন আর ঘটে না। মেলা উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আনন্দ আয়োজন চলে, যা এখন মিলনমেলায় রূপান্তরিত হয়েছে।”

শীতল মার্ডী বলেন, “একসময় এ মেলার নাম ছিল বউমেলা, এখন এটি আদিবাসীদের মিলনমেলা নামে পরিচিত। পূর্বপুরুষেরা এ মেলা শুরু করেছিলেন, আমরা সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে যাচ্ছি। কবে থেকে মেলার প্রচলন, তা সঠিকভাবে বলা যাবে না। বাপ-দাদার কাছে শুনেছি, যুগ যুগ ধরে এ মেলা আপনাআপনি চলছে। আমরা শুধু বাপ-দাদার পথ ধরে আনুষ্ঠানিকতা চালিয়ে যাচ্ছি।”

   

About

Popular Links

x