Monday, May 27, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

অভিযান হয়, অসাধু সরকারি কর্মকর্তারা থেকে যায় আড়ালে

  • বেইলি রোডের ঘটনার পর অভিযানে নেমেছে রাজউক, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস
  • রাজউকের কাছে সর্বশেষ ঢাকায় কতটি ভবন আছে তার হিসেব নেই
  • ঢাকার ভবনগুলোর মধ্যে ৮৮% ভবন অবৈধ
আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৪, ০৩:৪২ পিএম

ঢাকার বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে আগুনে ৪৬ জনের মৃত্যুর পর ‘‘জেগে উঠেছে” রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ(ডিএমপি)।

রবিবার (৩ মার্চ) রাত থেকে বহুতল ভবনে থাকা রেস্টুরেন্টের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে তারা। এখন প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ এই অপরিকল্পিত অভিযান কোনো কাজে আসবে কি-না। আরও যেসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আছে সেখানে অভিযান হচ্ছে না কেন?

এসব ভবনের সঙ্গে জড়িত সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কি রেহাই পেয়ে যাবে? আর এই অভিযান কতদিন চলবে?

অভিযানের রকমফের

প্রথমে শুরু করে ডিএমপি। রবিবার বিকেল থেকে তারা ধানমন্ডি,  মোহাম্মদপুর,  গুলশান ও বসুন্ধরা এলাকায় কমপক্ষে ৫০টি রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়ে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। অনেককে আবার সতর্ক করে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। অভিযানে আগুন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা আছে কি-না তা দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান।

অন্যদিকে সোমবার অভিযান শুরু করে রাজউক। তারা ধানমন্ডি সাত মসজিদ এলাকায় অভিযান চালিয়ে “‍‍‌গাউসিয়া ‍‍‌‌‌টুইন পিক” ভবনের ১২টি রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দিয়েছে। আর ওই ভবনে থাকা রুফটপ রেস্টুরেন্ট ভেঙে ফেলা হয়েছে। ১৫ তলা ভবনটিতে অফিসের অনুমোদন থাকলেও সেখানে রেস্টুরেন্ট, কাপড় এবং ওষুধের দোকান করা হয়েছে। আর ছাদ খোলা রাখার কথা থাকলেও সেখানে রুফটপ রেস্টুরেন্ট করা হয়েছে। এদিন সাত মসজিদ রোড এলাকায় কেয়ারি ক্রিসেন্ট ভবনও সিলগালা করে সেখান থেকে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। ওই ভবনে অভিযান চালায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। তবে সিটি কর্পোরেশনের অভিযানের আগেই খবর পেয়ে ওই ভবনের হোটেলগুলো বন্ধ করে দেয় মালিক কর্তৃপক্ষ।

এসব হোটেল-রেস্টুরেন্টকে কারা অনুমোদন দিল?

শুধু হোটেল-রেস্টুরেন্টে অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান।

তিনি বলেন,‘‘আমাদের সিটি কর্পোরেশন লাইসেন্স দিয়েছে। আমরা ভ্যাট-ট্যাক্স দিচ্ছি। ভবন মালিক রাজউকের অনুমোদন নিয়ে ভবন তুলেছে। রাজউক এতদিন কিছু বলেনি। আমরা তো মাত্র ভাড়া নিয়েছি। রেস্তোরাঁর সেফটি-সিকিউরিটির দায়িত্ব আমাদের। কিন্তু ভবনের সেফটি-সিকিউরিটির দায়িত্ব মালিকের। আমাদের কোনো নোটিশ না দিয়েই কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?”

১ মার্চ ওয়ারীর পেশওয়ারিন হোটেলে ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে/ঢাকা ট্রিবিউন

এই ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, “এসব হোটেল-রেস্টুরেন্টকে কারা অনুমোদন দিল? আমরা তো বহুবার বলেছি আমাদের সঙ্গে কথা বলে অনুমোদন দেন। কিন্ত তারা তা না করে নানা সুবিধা নিয়ে অনুমোদন দিয়েছে।”

রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির সদস্য ঢাকায় এক হাজার এবং সারাদেশে ৬০ হাজার বলে জানান তিনি। ফায়ার সার্ভিসের সর্বশেষ পরিদর্শনে রাজধানী ঢাকায় ২,৬০৩টি ভবন আগুনের অতি ঝুঁকিতে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১,১০৬টি বিপণিবিতান। অতি ঝুঁকির তাালিকায় ৮০১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ৩৪৫টি হাসপাতাল ও ৩২৫টি আবাসিক ভবন আছে।

রাজউকের ‌‘গোপন’ তালিকা

রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রকল্পের পরিচালক আশরাফুল ইসলাম জানান, ‘‘আমরা যে অভিযান শুরু করেছি তা পুলিশ পাওয়া সাপেক্ষে অব্যাহত থাকবে। আমাদের ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট আছে। তারা সবাই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। তবে অভিযান পরিচালনার জন্য আমাদের পুলিশ পেতে হবে।”

ঢাকার রেস্টুরেন্টগুলোই কি শুধু ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে, নাকি আরও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘‘না আরও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আছে। সেই সব ভবনেও আমরা অভিযান চালাব। আমরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখব।”

বেইলি রোডের সুলতানস ডাইন রেস্টুরেন্ট/গুগল ম্যাপ থেকে সংগৃহীত

তবে তালিকায় এরকম কতগুলো ভবন আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের কাছে মোটামুটি একটা তালিকা আছে। তবে আমরা তো তালিকা আগে প্রকাশ করব না। এটা গোপনীয় তথ্য।”

ড্যাপের সমীক্ষা প্রতিবেদন বলছে, ঢাকার ভবনগুলোর মধ্যে ৮৮% ভবন অবৈধ। আর বাকি ১২% কোনো না কোনোভাবে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। রাজউক এলাকায় মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার ভবনের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট আছে।

আইনে ‘যতটুকু’, পুলিশ করছে ‘ততটুকু’

এদিকে, ডিএমপির অভিযানও চলবে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার খ. মহিদ উদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘‘প্রত্যেক থানার ওসিরা তৎপর হয়েছেন। প্রত্যেক এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ হোটেল-রেস্টুরেন্টকে আমরা চিঠি দিচ্ছি, সতর্ক করছি। তারপর অভিযান চালাচ্ছি।”

এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘‘আমরা শুধু হোটেল রেস্টুরেন্ট না, আমরা মূলত কোনো স্থাপনায় ঝুঁকিপূর্ণ কোনো বস্তুর উপস্থিতির বিরুদ্ধেও অভিযান চালাচ্ছি। যা মানুষের প্রাণহানির কারণ হতে পারে। আইনে আমরা যেটুকু পারছি সেটুকু করছি। আরও অনেক অনিয়ম আছে। তা দেখার জন্য আরও সাতটি প্রতিষ্ঠান আছে। সবাই দেখলে আশা করি পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”

প্রয়োজন সমন্বিত অভিযান

তবে এই ধরনের যে যার মতো অভিযানের সমালোচনা করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান। তিনি বলেন, “ত্রুটিপূর্ণ ভবনের তালিকা আছে। সেটা ধরে সরকারের ছয়-সাতটি সংস্থা যারা এর দায়িত্বে আছে তাদের সমন্বিত অভিযান দরকার। তা না হলে এই অভিযান তেমন কাজে আসবে না।”

তিনি মনে করেন, ‘‘এখন শুধু রেস্টুরেন্টে অভিযান শুরু হয়েছে। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ তো আরও অনেক ভবন আছে। সেখানে অভিযান নেই কেন? আর রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়ে কর্মচারীদের আটক করা হচ্ছে। এটা অন্যায়। কারণ তারা তো কাজ করতে এসেছেন। ওই ভবনের মালিক, রেস্টুরেন্টের মালিক তাদের তো আটক করা হচ্ছে না। বেইলি রোডের ভবনের মালিককে তো এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি।”

১ মার্চ ওয়ারীর পেশওয়ারিন হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে/ঢাকা ট্রিবিউন

এই পরিকল্পনাবিদের মতে, ‘‘সমস্যা অনেক বড়। সেখানে হাত দিতে হবে। এসব ভবন, হোটেলের অনুমোদন কারা দিয়েছে? এখানে রাজউক, ফায়ার সার্ভিস, সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তরা জড়িত। তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না কেন? তাদের বিরুদ্ধে অভিযান কবে হবে? কে চালাবে?”

তালিকা ধরে অভিযানে নামবে ফায়ার সার্ভিস

ফায়ার সার্ভিসের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার জানান, তারাও সোমবার থেকে ধানমন্ডি এলাকায় অভিযান শুরু করেছেন।

তিনি বলেন,‘‘আমরা প্রথমে হোটেল-রেস্টুরেন্ট, এরপর হাসপাতাল, ক্লিনিকে অভিযান চালাব। পর্যায়ক্রমে সব স্থাপনায়ই তালিকা ধরে অভিযান হবে।”

রাজউকের কাছে সর্বশেষ ঢাকায় কতটি ভবন আছে তার হিসেব নেই। তবে রাজউকের ড্যাপ পরিকল্পনার আওতায় পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, ২০১৬ সালে মোট ভবনের সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৪৭ হাজার ১৭৪টি।

About

Popular Links