নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে বড় চমক দেখিয়েছেন ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী জোহরান মামদানি। প্রাথমিক ফলাফলে বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে আছেন তিনি। নির্বাচিত হলে মামদানি হবেন নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র। সংবাদমাধ্যম এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
স্থানীয় সময় বুধবার (২৫ জুন) রাতে প্রাথমিক ভোটে সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমোকে হারিয়ে জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে পরিচিত মামদানি।
এখনও ভোটের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হয়নি, তবে মামদানি বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কুয়োমো রাতেই হার মেনে নেন।
মামদানির জয়কে ডেমোক্রেটিক দলের প্রভাবশালী কুয়োমোকে সমর্থন করা মধ্যপন্থি নেতাদের জন্য এক বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, সারাদেশে ট্রাম্পের কট্টর ডানপন্থার মোকাবেলায় কোন পথ ধরে এগোবে, তা ঠিক করতে গিয়েই এখন দিশেহারা দলটি।
উগান্ডায় জন্ম নেওয়া স্টেট অ্যাসেম্বলিম্যান মামদানি শুরুতে কুয়োমোর চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন জনমত জরিপে। তবে, শেষদিকে নিউইয়র্কের মতো ব্যয়বহুল শহরে ভাড়া কমানো ও বিনামূল্যে ডে-কেয়ারসহ নানা জনমুখী বার্তা দিয়ে তিনি ব্যাপক সমর্থন পান।
নিউইয়র্কের প্রাথমিক নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মামদানিকে আক্রমণ ট্রাম্প বলেন, “সে হলো শতভাগ কমিউনিস্ট পাগল। তাকে বেছে নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা সীমা অতিক্রম করেছে।”
এদিকে বিজয় ভাষণে সমর্থকদের উদ্দেশে মামদানি বলেছেন, “আজ রাতে আমরা ইতিহাস গড়েছি। এই চমকপ্রদ জয় এবং পুরো নির্বাচনী প্রচার ভবিষ্যতে ডেমোক্রেটদের জন্য একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।”
তিনি রেডিও ডব্লিউএনএনওয়াইকে বলেন, “অনেকে বলেন ডেমোক্রেটিক পার্টি নাকি খুব বেশি বাম দিকে সরে গেছে। আসলে হয়েছে উল্টো। অনেকদিন ধরে শ্রমজীবী মানুষ পার্টি ছেড়ে দিয়েছে, আর পার্টিও তাদেরকে ছেড়ে দিয়েছে।’
মামদানির প্রতিদ্বন্দ্বী ৬৭ বছর বয়সী রাজনীতিবিদ কুয়োমো, যিনি যৌন হয়রানির কেলেঙ্কারির পর সরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন, পরাজয় স্বীকার করে মামদানিকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
নগর প্রশাসনের হিসাবে ৯৫% ব্যালট গণনা শেষে মামদানি পেয়েছেন ৪৩% ভোট। অপরদিকে, কুয়োমোর প্রাপ্ত ভোট প্রায় ৩৬%। ফলে তার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
তবে, নিউইয়র্ক সিটির নির্বাচনে “র্যাংকড-চয়েস ভোটিং” পদ্ধতি চালু আছে, যেখানে ভোটাররা পছন্দ অনুযায়ী পাঁচজন প্রার্থীকে নির্বাচন করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে, প্রার্থীরা সরাসরি ৫০% বেশি ভোট না পেলে, নির্বাচন কর্মকর্তারা সবচেয়ে কম ভোট পাওয়া প্রার্থীদের বাদ দিয়ে পুনরায় ভোট গণনা শুরু করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক লিংকন মিচেল বলেছেন, “এই ভোট ডেমোক্রেটিক পার্টির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের গণভোটের মতোই।”
সাবেক গভর্নর এবং গভর্নরের ছেলে হওয়ায় কুয়োমোর ছিল বিপুল অর্থ ও সর্বজনীন পরিচিতি। কিন্তু যৌন হয়রানির অভিযোগ ও কোভিড পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যর্থতার দায়ে তিনি চার বছর আগে পদত্যাগ করেন। এসব কেলেঙ্কারির ভার বইতে হয়েছে প্রচারের সময়।
তার বিপরীতে মামদানির উত্থান অভাবনীয়। ভারতীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসী পরিবারের সন্তান মামদানি, ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সমর্থনে লড়েছেন—যেটি একটি ছোট ও বামপন্থী রাজনৈতিক ধারা। যদিও অনেক ডেমোক্রেট নেতা মনে করেন, এই ধরনের চিন্তা-ভাবনা বাদ দেওয়া উচিত।
এছাড়া, মামদানি ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলেন এবং ইসরাইলকে “গণহত্যাকারী” বলায় ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সমালোচানা করেছেন।
মামদানির সমর্থকদের মধ্যে রয়েছেন ট্রাম্পের কট্টর বিরোধী দু’জন। এরা হলেন বামপন্থী সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং প্রগতিশীল কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কোর্টেজ।
ওকাসিও কোর্টেজ সামাাজক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এর এক পোস্টে লিখেছেন, “ধনীরা আর লবিস্টরা কোটি কোটি টাকা ঢেলেছে তোমার বিরুদ্ধে, তবু তুমিই জয়ী হয়েছো।”
বর্তমানে নিউইয়র্কের কুইন্স এলাকার স্টেট অ্যাসেম্বলিম্যান মামদানির ভবিষৎ পরিকল্পনায় আছে নিউইয়র্কে ভাড়া বাড়ানো বন্ধ করা, বাস ভাড়া ফ্রি করা ও সবার জন্য শিশুসেবা দেওয়া। যে শহরে তিন বেডরুমের একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া ৬ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়, সেখানে মামদানির এই ঘোষণা সাধারণ ভোটারের হৃদয় ছুঁয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে মামদানি উর্দু ভাষায় ভিডিও, বলিউড ক্লিপ এবং স্প্যানিশ ভাষা ব্যবহার করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি, বিশেষ করে জেনজিদের মধ্যে।
নভেম্বরে চূড়ান্ত মেয়র নির্বাচনে মামদানির লড়াই হবে আরও কয়েকজন প্রার্থীর সঙ্গে, যার মধ্যে রয়েছেন বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামস। যদিও তিনি ডেমোক্রেট দলের সমর্থক, তবে এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন।
মামদানির পরিচয়
জোহরান কোয়ামে মামদানি ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে পরিচিত। তিনি উগান্ডার প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ মাহমুদ মামদানি ও বিখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ারের ছেলে।
মামদানির জন্ম উগান্ডার কামপালায়। তিনি সাত বছর বয়সে নিউইয়র্কে চলে আসেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের মেইনের বোডিন কলেজ থেকে আফ্রিকান স্টাডিজে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি কম আয়ের পরিবারদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ ঠেকাতে হাউজিং কাউন্সেলর হিসেবে কাজ করতেন। ২০২০ সালে নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির ৩৬ নম্বর আসন থেকে কাউন্সেলর নির্বাচিত হন মামদানি। তিনি কুইন্সের আস্টোরিয়া এলাকা প্রতিনিধিত্ব করেন।
চলতি বছরের শুরুতে মামদানি বিয়ে করেছেন ২৭ বছর বয়সী সিরীয় শিল্পী রামা দুয়াজিকে। তিনি ব্রুকলিনে থাকেন। রামার শিল্পকর্ম দ্য নিউইয়র্কার, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও ভাইস-এর মতো আন্তর্জাতিক সংবাধমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি অ্যানিমেশন ও সিরামিক শিল্পেও কাজ করেন।



