Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মাহমুদুর রহমান মান্না ভাইয়ের বয়স কত?

মান্না অতি সম্প্রতি জাতীয় পার্টি ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদের বয়স ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে কটাক্ষ করে বক্তব্য রাখেন

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:২৬ পিএম

স্বাধীনতার পর মান্না ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জাসদ সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের একজন তুখোড় নেতা ছিলেন। নিজস্ব জনপ্রিয়তায় চবি ছাত্র সংসদের (চাকসু) ভিপি ও পরবর্তীতে একই ছাত্র সংগঠনের মনোনয়ন নিয়ে ঢাবি ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি জাসদ সমর্থিত ছাত্র সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে ১৯৬৯ সালে মান্না ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে “অনেক সূর্যের আশা” নামে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে সক্রিয় ছিলেন। সেই তখন থেকেই মান্না ভাইকে চিনতাম ও জানতাম।

৭২ থেকে ৭৫-এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত জাসদ ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের কট্টর সমালোচক ছিল। ছাত্রনেতা মান্না ভাই তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। অনেকে বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগ বিরোধীদের কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ছিল না, তই তাদের অনেকেই এই সময় জাসদে এসে ভিড় করে। ফলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল খুব সহজেই একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। অন্যদিকে এই দলটি এক ধরনের “বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের” স্লোগান তুলে দেশের তরুণ ও যুব সমাজকে টানতে সক্ষম হয়। 

আজকের মাহমুদুর রাহমান মান্না ভাই এই দলেরই এক উদ্ভাবন।

বিভিন্ন কারণে পথ হারিয়ে জাসদ ৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। দেশের বর্তমান রাজনীতিতে দলটির তেমন কোনো অবস্থান নেই বললেই চলে। তবে আশ্চর্য হলেও সত্য হল কট্টর আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না এক সময় সবাইকে অবাক করে শেখ হাসিনার হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। 

তিনি ’৯১ থেকে মোট তিনবার বগুড়ায় নির্বাচন করেছেন। প্রথমবার জনতা মুক্তি পার্টি ও পরের দুবার আওয়ামী লীগের হয়ে। মাহমুদুর রাহমান মান্না বাসদ, তারপর নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক, আওয়ামী লীগ এবং এখন খুব সম্ভবত কোনো একটি রাজনৈতিক ব্যানার নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সঙ্গে মিলে ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন আন্দলনে সক্রিয়। বর্তমানে তিনি সেই ’৭২ থেকে ’৭৫-এর মতো কথায় কথায় আওয়ামী লীগ ও তার এক সময়ের প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনার প্রচণ্ড সমালোচক।

শুনেছি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে বগুড়ায় পর পর দুইবার পরাজিত হওয়ার পর মাহমুদুর রহমান মান্না ভাই নাকি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে আবেদন করেছিলেন তাকে ঢাকা থেকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য। কিন্তু শেখ হাসিনা তা না দেওয়ায় তিনি দল ও দলের নেত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট হন। তবুও হাল ছাড়েননি মান্না ভাই। তার শেষ আবদার নাকি ছিল মেয়র নির্বাচনে ঢাকা থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হওয়া। তার সেই আবদারও মেটেনি। তবে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা অতীত কার্যকলাপ ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে আওয়ামী লীগের মতো একটি বিশাল রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক করেছিলেন মান্নাকে। কিন্তু তাতে হয়ত তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাই আবারও দিলেন রাজনীতিতে ডিগবাজি। হয়ে গেলেন আওয়ামী লীগের বিরোধী কণ্ঠস্বর ।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক থাকাকালীন ঢাকার কল্যাণপুরে আমার সঙ্গে মান্না ভাইয়ের অনেকদিন পর দেখা হয়। সুইডেন থেকে প্রকাশিত “প্রবাসীর কণ্ঠ” নামে মাসিক পত্রিকার জন্য একটা ইন্টারভিউ নিই। 

দেখে নেওয়া যাক সেদিন আমার নেওয়া ইন্টারভিউতে তিনি কী বলেছিলেন, আর আজ তিনি কী বলেন।

প্রশ্ন: একসময় আপনি আওয়ামী লীগের বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। অথচ এখন আপনি আওয়ামী লীগের পক্ষে একজন কণ্ঠস্বর। আপনি আওয়ামী লীগে কেন এলেন?

মান্না: আমি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতাম। ’৮০-র দশকের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে ঢালাও পরিবর্তন নিয়ে আসে তাতে প্রমাণিত হয়, সমাজতন্ত্র আর সম্ভব নয়। সমাজতন্ত্র আর চলবে না। আওয়ামী লীগ সমাজতান্ত্রিক দল নয়। তবে সমাজতন্ত্রের যে ধ্যান-ধারণা আছে তা কিছুটা হলেও আওয়ামী লীগের মধ্যে আছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ হলো একটি রাজনৈতিক দল যে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে। এসব কিছু ভেবে-চিন্তে আমি আওয়ামী লীগে যোগদান করি। 

প্রশ্ন: আপনার নির্বাচনী এলাকা বগুড়ায় বার বার বিএনপির বিজয়ের কারণ কী বলে আপনি মনে করেন? 

মান্না: এই নির্বাচনী এলাকাটা আসলে এক সময়ের মুসলিম লীগের একটি শক্ত এলাকা। যারা এখানে একসময় মুসলিম লীগ করতো তারাই পরবর্তীতে এখানে বিএনপির রাজনীতিতে চলে আসে এবং এদের সাথে এসে জোট বাঁধে জামায়াত। বিএনপি ও জামায়াতের যৌথ শক্তি একত্রিত হওয়ায় এলাকাটা বিএনপির ঘাঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

প্রশ্ন: বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি জামাত জোট সরকারের মতে, দেশের এই অর্থনৈতিক মন্দার প্রধান কারণ বিগত আওয়ামী লীগ সরকার,মন্তব্য করুন? 

মান্না: কী আর বলব, এ ধরনের ফালতু কথার কোনো মূল্য ও প্রমাণ নেই। বর্তমান অর্থমন্ত্রীর (সাইফুর রাহমান) বক্তব্য হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই নয়।

রাজনীতিতে বার বার ডিগবাজি খাওয়া মান্না ভাই অতি সম্প্রতি জাতীয় পার্টি ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদের বয়স ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে কটাক্ষ করে বক্তব্য রাখেন। 

শেখ হাসিনা,বেগম খালেদা জিয়া ও রওশন এরশাদের বয়সে একে-অপরের চেয়ে খুব একটা বেশি নয়। প্রবীণ তিন নারীই দেশের তিনটি বড় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দেশের রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় নারী নেতৃত্ব মেনে নেওয়া খুব সহজ নয়। ইদানিং বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের সর্বক্ষেত্রে সামনে আসা অবশ্যই একটি ইতিবাচক লক্ষণ। এজন্য সব প্রশংসার দাবি রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বর্তমানে বেগম খালেদা জিয়া ও রওশন এরশাদ শারীরিক অসুস্থতার কারণে দুর্বল হয়ে পড়লেও শেখ হাসিনা কর্মঠ। তাই যেকোনো প্রসঙ্গে কারো বয়স নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা ঠিক নয়। কারণ শুধু মানুষ নয়, এই বিশ্বে সব প্রাণীর চলমান পথ এক।

রাজনীতিতে বয়স বলে কোনো কথা নেই। যতদিন মানুষ রাজনীতিতে থাকতে চায় ততদিন থাকলে দোষ কথায়? রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার অধিকার প্রত্যেকেরই আছে। এজন্য বয়স কোনো বাধা হতে পারে না। তবে বার্ধক্যের কারণে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে ভিন্ন কথা। শুধু রাজনীতিবিদ নয়, যেকোনো ব্যক্তিরই বয়স নিয়ে কথা বলা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত তার উত্তরটা মান্না ভাই নিজেই বলতে পারবেন। 

তাই জানতে ইচ্ছা হয়, আমাদের মান্না ভাইয়ের বয়স কত? এই বয়সে তিনি কি শারীরিক দিক দিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ? আমার ধারণা এই রাজনৈতিক নেতার বর্তমান বয়স ৭৩ বা তার বেশি। এই বয়সে তার আরেকজন নারী রাজনীতিবিদের বয়স ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে সমালোচনা করা উচিৎ হয়নি বলে আমি মনে করি। 

নাকি এটি মান্না ভাইয়ের স্লিপ অব টাঙ?

সুইডেনে “বয়স বৈষম্য” বলে একটি আইন আছে। এই বয়স বৈষম্যে আইনের মানে হলো, অন্যদের চেয়ে বয়সে ছোট বা বড় হওয়ার কারণে কারো প্রতি কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না। করলে ভুক্তভোগীর আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ আছে। 

অন্যদিকে, সুইডিশ রাজনীতিতে বয়স বলে কোনো কথা নেই। সুইডিশ লিবারেল পার্টির বারব্রু ভেসটারহল্ম নামে একজন সংসদ সদস্যের জন্ম ১৯৩৩ সাল। তিনি ২০২২ সাল পর্যন্ত পার্লামেন্ট মেম্বার ছিলেন। তখন তার বয়স ছিল ৮৯ বছর। ২০২৩ সালের ১৩ জানুয়ারি তিনি মারা যান। সুইডেনের বর্তমানে পার্লামেন্টে ৭২ থেকে ৭৭ বয়সের চারজন ও ১৮ থেকে ২৩ বছর বয়সের দুইজন সংসদ সদস্য আছেন ।

জানি না বাংলাদেশে বয়স বৈষম্যে আইন বলে কিছু আছে কি-না। না থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের একটি আইন সংসদে পাশ করলে ভালো হয়। তাহলে কেউ আর কারও বয়স নিয়ে কখনো কটাক্ষ করতে পারবে না। আমি এখানে সুইডেনের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো তুলনা করছি না। তবে বয়স বৈষম্যে আইন সব দেশে ছোট বড় সবার জন্য ইতিবাচক।

লেখক সাবেক ইলেক্টেড মেম্বার মনোনয়ন বোর্ড, সুইডিশ লেফট পার্টি সেন্ট্রাল কমিটি
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

About

Popular Links