Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতিতে পরিবর্তন জরুরি

মালিক কর্তৃক শ্রমিক শোষণ বন্ধ করতে হলে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৪, ০৮:৪৮ পিএম

বাংলাদেশের বিগত সরকার গত বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২, ৫০০ টাকা নির্ধারণ ও গ্রেড সাত থেকে পাঁচে কমিয়ে এনে একটি গেজেট প্রকাশ করে। গত ১ ডিসেম্বর থেকে এই নতুন মজুরি কার্যকর হওয়ার কথা এবং এ বছরের জানুয়ারি থেকে নতুন কাঠামোয় পোশাক শ্রমিকরা বেতন পাবেন বলে বলা হয়েছিল। এই ১২,৫০০ টাকার মধ্যে মূল বেতন ন্যূনতম ৬,৭০০ টাকা, বাড়ি ভাড়া ৩,৩৫০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৭৫০ টাকা, পরিবহন ভাতা ৪৫০ টাকা ও খাদ্য ভাতা ১,২৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশ ও বিদেশে প্রশংসিত হয়। অতীতে সর্বনিম্ন বেতন বলে কোনো কথাই ছিল না। ফলে মালিকরা শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে নানাভাবে গাফিলতি করার সুযোগ পেয়েছে। বিগত সরকারের এই বেতন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসা পেতে পারে। তবুও এই বেতন বৃদ্ধি মালিকের আয়ের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মনে করেন। দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের দিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিশেষভাবে নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

গার্মেন্টস শিল্পকে রক্ষা করতে হলে সরকারের প্রথমেই উচিত হবে ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতিতে একটা পরিবর্তন আনা। অতীতে সামরিক বাহিনী সমর্থিত ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ ব্যাপারে একটা বড় পরিবর্তন আনার চিন্তা ভাবনা করেছিলেন এবং কিছু কিছু পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছিলেন। তবে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মাঝপথে সবকিছু এসে থমকে দাঁড়ায়। আমি মনে করি, মালিক কর্তৃক শ্রমিক শোষণ বন্ধ করতে হলে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন। প্রয়োজন শ্রম আইনের সংস্কার, প্রয়োজন রাজনৈতিক দল মুক্ত ট্রেড ইউনিয়ন, প্রয়োজন গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র। গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটি বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো আলোচনা করতে দেখা যায়নি। পর্যবেক্ষকমহল মনে করে, দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নিজ নিজ দলীয় স্বার্থ এখানে সরাসরিভাবে জড়িত বলেই এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে তারা এড়িয়ে যেতে চান। অথচ এ ধরনের পরিবর্তন শ্রমিক মালিক এবং দেশের শিল্পক্ষেত্রে একটা বিরাট অবদান রাখার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। একমাত্র শ্রমিক মালিক সুসম্পর্ক একটি শিল্পকে লাভবান করে তুলতে পারে।

অন্যদিকে, চাকরি ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা তুলনামূলকভাবে যথেষ্ট নয়। শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য কোনো বিশেষ সুযোগ সুবিধা নেই বললেই চলে। উদাহরণস্বরূপ, দৈনন্দিন কর্ম সময় নির্ধারণ, সন্ধ্যা কিংবা রাতের কাজে বেতনের পরিমাণ বৃদ্ধি ও ছুটির দিনে কাজ করলে ডাবল বেতনের ব্যবস্থা, সময়মতো লাঞ্চ ও টি-ব্রেক। এক্ষেত্রে, টি-ব্রেক হতে হবে পেমেন্টসহ ইত্যাদি আরও অনেক কিছু আছে যা শ্রমিকদের সুরক্ষা বৃদ্ধি করবে। তাছাড়া শ্রমিকদের জীবন বিমা, পেনশন ভাতা, দীর্ঘ মেটারনেটি লিভ, চিকিত্সা ও বাত্সরিক ছুটি, ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পরিমাণমতো নয় বলে অভিযোগও রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর দুর্নীতি ও মালিক এবং সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর অবহেলা প্রধান কারণ বলে অনেকে মনে করেন।

বিশ্ব বাজারে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ থেকে পোশাক শিল্পকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশের অস্থিতিশিল রাজনৈতিক অবস্থা আমদানিকৃত কয়েকটি সুইডিশ কোম্পানি সঠিক সময়ে তাদের ডেলিভারি না পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বস্ত্র শিল্পে উন্নয়ন ও বিভিন্ন কাঠামো পরিবর্তনের লক্ষে সাবেক সরকারের আমলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও শেষ পর্যন্ত তার কতটুকু পূরণ হয়েছে বলে আমি জানি না। তবে সাবেক সরকারের এ ধরনের উদ্যোগকে ওই সময় সুইডিশ হিউমেন রাইটস (সুয়েড ওয়াচ) ইতিবাচকভাবে দেখেছিল।

পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, সরকার ও দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতি সম্পর্কিত বিষয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসা উচিত। তা না হলে পোশাক শিল্পের এই বাজার বাংলাদেশ থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ার সম্ভবনা দেখা দিতে পারে। যদিও সুইডিশ হিউম্যান রাইটস সুয়েড ওয়াচের একজন মুখপাত্র স্থানীয় মিডিয়ায় একসময় বলেছিলেন, বাংলাদেশে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধিসহ সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা হলেও অন্যান্য দেশের তুলনায় খরচ ততটা বাড়বে না। এজন্য পোশাক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কোনো প্রয়োজন হবে না। সুতরাং এখন সারা বিশ্বের চোখ দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওপর।

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, সাবেক ইলেকটেড ভাইস প্রেসিডেন্ট, ইউনিয়ন অব সার্ভিস এন্ড কমিউনিকেশন এমপ্লয়েস (SEKO POST) স্টকহলম সাউথ ব্রাঞ্চ।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x