আগামী জুলাই-আগস্ট মাসের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। দলটি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে দেশ পরিচালনা নিশ্চিত করতে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা দলটির অন্যতম প্রধান লক্ষ। বিএনপি দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে। বিএনপি নেতারা মনে করেন, নির্বাচন যত বিলম্বিত হবে, ততই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট বাড়বে। গত সোমবার রাতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির সভায় এ বিষয়ে সরকারকে চাপ প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিএনপির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
স্থায়ী কমিটির ওই সভার সিদ্ধান্ত জানাতে মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “আমরা মনে করি, নির্বাচন বিলম্বিত করার কোনো কারণ নেই। এই বছরের মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ জুলাই অগাস্টের মধ্যেই নির্বাচন সম্ভব।” দেশের স্বার্থে আগামী জুলাই আগস্ট মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করার জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে গত ১৬ ই ডিসেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে ২০২৫ সালের শেষ থেকে ২০২৬ সালের প্রথম দিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এরপর প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের ব্যাখ্যা করে তার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছিলেন, “আশা করতে পারেন যে নির্বাচন ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে হবে।”
তবে বিএনপি নেতারা মনে করেন, নির্বাচন আয়োজনের জন্য খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন নেই। নির্বাচন কমিশনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সংস্কার শেষে আগস্টের মধ্যে নির্বাচনের আয়োজন করা সম্ভব। তবে এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন না করা হলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিএনপির নেতারা।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “এখন সময়টা খুবই সেনসিটিভ। খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়, জাতি এখন একটা অত্যন্ত ক্রান্তিকালে অবস্থান করছে। এর থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের যে পথটা এই পথটাকে কোন ভাবেই যেন আমরা খুব বেশি বাধাগ্রস্ত না করি সেই আহ্বানটা আমাদের সকলের প্রতি থাকবে।”
বিএনপি কেন জুলাই-আগস্টের মধ্যে নির্বাচন দাবি করছে এমন প্রশ্ন করা হলে দলটির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “সরকার চাইলে আরও আগে নির্বাচন আয়োজন করতে পারে। আমরা সরকারকে বেশ কিছুটা সময় দিচ্ছি। আর নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি তো নির্বাচন কমিশনের। এখানে সরকারের কোনো বিষয়ও নেই। আমরা দেখছি দেশের আইন-শৃঙ্খলা, মানুষের নিরাপত্তার ব্যাপক অবনতি হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই আমরা চাই এসব সমস্যা দূর করতে দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হোক।”
সরকার সংস্কার শেষে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলছে। বিএনপি কী সরকারকে সংস্কারের সময় দেবে না- এমন প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, “আমরা সরকারকে সংস্কার করার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছি। সংস্কারের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলমান রয়েছে। আমরা আরও বেশকিছু সময় তাদের দিতে চাচ্ছি। এই সময়ের মধ্যে তারা সংস্কার শেষ করে নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে।”
জুলাই-আগস্টের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচন আয়োজন না করলে বিএনপি আন্দোলনে যাবে কি-না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “কথায় কথায় আমরা আন্দোলন করতে চাই না। আমরা এই সরকারকে সমর্থন দিয়েছি এবং দিয়ে আসছি। আমরা চাই জনগণের ভাষা বুঝে সরকার দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করবে।”
জাতি নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছে দাবি করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা জুলাই-আগস্টের আগেই নির্বাচন চাই। জাতি এখন একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে। আমরা বলছি নির্বাচনের জন্য যে যে সংস্কার প্রয়োজন তা সম্পন্ন করে নির্বাচন আয়োজন করতে। নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং সংস্কার একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।”
তিনি বলেন, এই সরকারের প্রধান কাজ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। নির্বাচনের জন্যই তো আমরা একটি ফ্যাসিবাদী সরকারকে সাক্ষাৎ করেছি। যদি নির্বাচন নিয়ে কোনো বাহানা করা হয় তাহলে জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করবে।”
জুলাই-আগস্টের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা না হলে বিএনপি কী পদক্ষেপ নেবে- এমন প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, “নির্বাচন না হওয়ার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে। নির্বাচন ছাড়া দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আমরা চাই নির্বাচনের প্রস্তুতি ও সংস্কার কাজ একসঙ্গে চলবে।”
বিএনপির মতোই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের মত দিয়েছেন। তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি নির্ভর করছে সরকারের আন্তরিক ইচ্ছার ওপর। তারা চাইলে যেকোনো সময় একটি নির্বাচন আয়োজন করতে পারে। আমরা রাজনৈতিকদলগুলো নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত রয়েছি। ভোটাররাও ভোট দিতে প্রস্তুত রয়েছেন। আমরা মনে করি ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে একটি নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব।”
সংস্কারের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “দুনিয়াতে সংস্কার একটি চলমান বিষয়। সংস্কারের কথা বলে নির্বাচন বন্ধ রাখা যাবে না। নির্বাচন করার জন্য যেসব সংস্কার প্রয়োজন সেগুলো করে দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে বাকী সংস্কার করবে। যদি তারা জনগণকে দেওয়া প্রতিস্তুতি না রাখে তাহলে জনগণ তাদের বিচার করবে। আর এই সরকার তো ভালোভাবে কাজ করতে পারছে না। যত দেরি হবে ততো অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। তাই আমরা দ্রুত নির্বাচন চাই।”
গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “সরকারের উচিত হবে জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে নির্বাচনের একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করা। তারা যেহেতু নির্বাচনের কোনো রোডম্যাপ দিচ্ছে না ফলে আমাদের ভিতরে একটি সন্দেহের দানা বাধছে। আমরা অন্যান্য দলের মতো দ্রুত নির্বাচনের একটি রোডম্যাপের ঘোষণা চাই।”



ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে দ্বিকক্ষ সংসদ চায় বিএনপি
নির্বাচন যত বিলম্বিত হবে, সমস্যা ততই তীব্র হবে
যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে নির্বাচনী কৌশল সাজাচ্ছে বিএনপি