ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে সফল দল, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও ফুটবলের আসল মোড়ল হিসেবে পরিচিত ব্রাজিল। কিন্তু এই গৌরবোজ্জ্বল পাঁচ তারকার পেছনের ইতিহাস কি সম্পূর্ণ নিষ্কলঙ্ক? সাম্প্রতিক সময়ে ফুটবল বিশ্লেষক ও বর্তমান প্রজন্মের ‘জেনজি’ ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে জোর আলোচনা চলছে যে, সেলেসাওদের প্রতিটি বিশ্বকাপ জয়ের পেছনেই জড়িয়ে রয়েছে কোনো না কোনো কুখ্যাতি, কলঙ্ক কিংবা বিতর্ক। তিনটি ‘জুলে রিমে’ ট্রফি থেকে শুরু করে পরবর্তী দুটি ট্রফি, সবখানেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে ফুটবলের এই পরাশক্তি।
সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপ, যা বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই পর্দায় সরাসরি দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছে। সেই আসরে ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের পথে একাধিক ম্যাচে চরম বিতর্কিত সব ঘটনা ঘটে।
২০০২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচে ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড রিভালদো মাঠের ভেতরে এক ‘অস্কারজয়ী’ অভিনয়ের আশ্রয় নেন। তুরস্কের একজন ডিফেন্ডার নিয়ম মেনে বল কিক করে নিজেদের গোল বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন, যা রিভালদোর পায়ে গিয়ে আঘাত করে। কিন্তু রিভালদো এমনভাবে মুখে হাত দিয়ে মাঠে লুটিয়ে পড়েন, যেন তার মুখে বড় আঘাত লেগেছে। এই চরম প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে রেফারি তুর্কি খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখান। পরবর্তীতে ভিডিও ফুটেজে অভিনয় প্রমাণিত হলে ফিফা রিভালদোকে বড় অঙ্কের জরিমানা করে।
বিতর্ক সেখানেই থামেনি। একই আসরে তুরস্কের বিপক্ষে ডি-বক্সের বাইরে ফাউল হওয়া সত্ত্বেও ব্রাজিলকে উপহার দেওয়া হয়েছিল একটি পেনাল্টি। এরপর নকআউট পর্বে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচে জ্যামাইকান রেফারি পিটার প্রেন্ডারগাস্ট বেলজিয়ামের একটি সম্পূর্ণ বৈধ হেডের গোল বাতিল করে দেন। দুর্দান্ত সেই গোলের লিড হারানোর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে বেলজিয়াম এবং শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ব্রাজিল জিতে নেয়। বিশ্লেষকদের মতে, সেবারের টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের জয়কে ‘জয়’ না বলে রেফারির কল্যাণে ‘জোরপূর্বক’ জয় বলাই শ্রেয়।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে চিলির বিপক্ষে ব্রাজিলের ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ঘটনার জন্ম দেয়। ম্যাচ চলাকালীন গ্যালারি থেকে একটি আতশবাজি মাঠের ভেতরে এসে পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে চিলির গোলরক্ষক দাবি করেন তিনি আহত হয়েছেন এবং রক্তাক্ত মুখে মাঠ ছাড়লে ম্যাচটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল ব্রাজিলের সমর্থকরাই এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে নিবিড় তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেখা যায়, আতশবাজির কোনো আঘাতই গোলরক্ষকের গায়ে লাগেনি; বরং তিনি পূর্বপরিকল্পিতভাবে নিজের কাছে থাকা ব্লেড দিয়ে নিজের মুখ কেটে আহত হওয়ার নাটক করেছিলেন। যদিও এই ঘটনায় সরাসরি ব্রাজিলের কোনো দোষ ছিল না, তবুও তাদের ফুটবল ইতিহাসে এটি একটি বড় দুষ্কৃতি হিসেবে লেখা রয়েছে।
১৯৭০ সালে ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের পেছনে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র গোপন হাতের চাঞ্চল্যকর দাবি এখন কাঁপিয়ে দিচ্ছে পুরো ফুটবল বিশ্বকে। ব্রিটিশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক গ্যাব্রিয়েল গেটহাউজ এবং তৎকালীন ইংলিশ গোলরক্ষক গর্ডন ব্যাঙ্কসের নাতি এড জার্ভিসের দীর্ঘ তিন বছরের অনুসন্ধান শেষে সামনে উঠে এসেছে এই রহস্য।
তাদের দাবি, স্নায়ুযুদ্ধের সেই উত্তাল সময়ে ইংল্যান্ডকে দুর্বল করে লাতিন আমেরিকায় শক্তি বৃদ্ধির পরিকল্পনা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। সেজন্যে ব্রাজিলকে বাড়তি সুবিধা দিতেই পর্দার আড়ালে বোনা হয়েছিল এক ষড়যন্ত্রের জাল।
সেই ষড়যন্ত্রের প্রথম ছক কাটা হয়েছিল কলম্বিয়ায়, ১৯৭০ বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে। একটি ব্রেসলেট চুরির মিথ্যা অভিযোগে আচমকাই আটক করা হয় সেই সময়ে ইংল্যান্ড দলের অধিনায়ক ববি মুরকে।
যদিও পরে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ মেলেনি, তবে এই ঘটনাটি আগের বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড দলের মানসিক পরিস্থিতি অনেকটাই ধসিয়ে দিয়েছিল।
ব্রাজিলের তিনটি বড় অর্জন ছিল মূলত ‘জুলে রিমে’ ট্রফি। তৎকালীন সেই ট্রফি ও টুর্নামেন্টের মান আধুনিক বিশ্বকাপের সমকক্ষ ও ততটা প্রতিযোগিতাপূর্ণ ছিল কিনা, তা নিয়েও ফুটবল গবেষকদের একাংশের মধ্যে বড় ধরনের বিতর্ক রয়েছে।
সব বিতর্ক, জল্পনা-কল্পনা ও সমালোচনাকে ছাপিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের চোখ এখন চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে। অতীতের এই কলঙ্কিত অধ্যায়গুলো পেছনে ফেলে লাতিন আমেরিকার এই পরাশক্তি এবার তাদের বহুল প্রতীক্ষিত ‘মিশন হেক্সা’ বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ট্রফি নিজেদের ঘরে তুলতে পারবে কিনা, তা এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা।



