সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে কালিগঞ্জ থানার কৃষ্ণনগর এলাকা থেকে পুলিশ ও এসআরবির যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দেবহাটা থানার ওসি এইচ এম শাহীন জানান, এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে জানানো হবে। এর আগে এ মামলায় আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আমিনীসহ এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হলেন তিনজন। বাকি আসামিদের ধরতে পুলিশের একাধিক দল মাঠে আছে বলে জানান ওসি। তার ভাষ্য, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে দ্রুতই বাকিদের আইনের আওতায় আনা হবে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার শামীম ও তার স্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য আছে এমন অভিযোগ উঠলে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয় এবং শামীমের বাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয়। ওই দিন স্থানীয় একটি বাজারে প্রথম দফায় তাঁকে মারধর করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে তিনি এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তখন একদল লোক তাকে চেম্বার থেকে বের করে আবার মারধর করে। পুলিশ উদ্ধার করে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। কিন্তু রাতে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে মিছিল নিয়ে হাসপাতালে হামলা হয়। হামলাকারীরা সেখান থেকে শামীমকে ছিনিয়ে নিয়ে আবার পেটায়। পরে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
এ ঘটনায় শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে প্রধান আসামি করা হয়েছে ফজলুল হক আমিনীকে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, আমিনী এর আগেও বিভিন্ন ঘটনায় মব সৃষ্টি ও বিচারবহির্ভূত নির্যাতনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের দাবি, আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকায় প্রতিবার তিনি পার পেয়ে গেছেন এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পারুলিয়া এলাকায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পারুলিয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলামকে মারধর করা হয়। একই বছরের অক্টোবরে সোহাগ হোসেন নামের এক যুবকের বাড়িতে মব তৈরি করে গণপিটুনি দেওয়া হয়। পারুলিয়া ১ নম্বর ইউনিয়নের এক সদস্যের বিরুদ্ধেও ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাঁর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনায় বারবার আমিনীর নামই নেতৃত্বদানকারী বা উসকানিদাতা হিসেবে উঠে এসেছে।
আমিনী নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন বলে দাবি করেন। তিনি জানান, ধর্ম অবমাননার কোনো ঘটনা ঘটলে তিনি সবসময় নিজের জায়গা থেকে নেতৃত্ব দেন এবং আগের ঘটনাগুলোতেও উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফেসবুকে স্ট্যাটাস ও লাইভের মাধ্যমে লোক জড়ো করার কথাও তিনি স্বীকার করেন। তাকে ধরা হলে আপত্তি নেই এবং ফাঁসি বা জেল হলেও আফসোস থাকবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। নিজের পরিচয় হিসেবে তিনি জানান, পারুলিয়া বাজারে গরু-ছাগল জবাইয়ের পাশাপাশি মোটরসাইকেল চালক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভিন্ন মসজিদে ইমামের প্রক্সি দেন। মামলার পর থেকে তাকে এলাকায় দেখা যায়নি, তবে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নিজের পক্ষে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছিলেন বলে জানা যায়। শামীমের পরিবার তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছিল।
মানবাধিকারকর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, “কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না। রাষ্ট্র এখনই জোরালো পদক্ষেপ না নিলে এ ধরনের মব সন্ত্রাস বারবার ঘটতে থাকবে।” তার মতে, আমিনী প্রকাশ্যে বিচারবহির্ভূত শাস্তির ঘোষণা দিয়ে নিজেকে “স্বঘোষিত অপরাধী”তে পরিণত করেছেন, তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচিত তাকে কোনোভাবেই ছাড় না দেওয়া।



