“জন্মিলে মরিতে হবে”, একথা যেমন সত্য; তেমনিভাবে এটাও ধ্রুব সত্য যে, কোনো কোনো মৃত্যু শুধু শরীরের প্রস্থান মাত্র। কিছু কিছু মানুষ তাদের কর্ম ও সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যান যে, মৃত্যু তাদের জন্য কেবল জাগতিক নিয়ম রক্ষার আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। তারা বেঁচে থাকেন মানুষের জীবিকায়, শিক্ষায়, সৃষ্টিশীল চিন্তার খোরাক হয়ে।মৃত্যুর চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তাদের জন্ম, যে জন্ম সৃষ্টি ও কল্যাণের। তেমনই একজন কৃতিমান ব্যক্তি কাজী শাহেদ আহমেদ।তবে কাজী শাহেদ আহমেদ শুধু ব্যক্তি নন, তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। একটি প্রতিষ্ঠান বললেও ভুল হবে, কাজী শাহেদ আহমেদ একাই অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান। যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য মানুষ শিখছে, পড়ছে, রুটি-রুজির ব্যবস্থা করছে, কথা বলছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
একজন মানুষের মধ্যে মানবকল্যাণের যতটা গুণাবলী থাকা সম্ভব তার প্রায় সবটাই যেন কাজী শাহেদ আহমেদ পেয়েছেন। দেশমাতৃকার কল্যাণে সেনবাহিনীতে চাকরি, দেশ ও মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবসা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে সংবাদপত্র, সৃষ্টিশীল চিন্তার পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশনা, জাতি গঠনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্রীড়াক্ষেত্রে নেতৃত্ব। একসঙ্গে এতকিছু কজনা’র দ্বারা সম্ভব?
কাজী শাহেদ আহমেদ যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে। সমৃদ্ধ হয়েছে দেশ, জাতি, সমাজ।
কাজী শাহেদ আহমেদকে বলা হয় বাংলাদেশের আধুনিক সাংবাদিকতার পথপ্রদর্শক। দেশের অসংখ্য বরেণ্য সাংবাদিকদের অনুপ্রেরণা তিনি। “দৈনিক আজকের কাগজ”এর প্রকাশক ও সম্পাদক তিনি। বাংলাদেশের আধুনিক সাংবাদিকতায় মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচেতনার যে উপস্থিতি তা কাজী শাহেদ আহমেদের হাত ধরেই শুরু। “খবরের কাগজ”এরও প্রকাশক ছিলেন তিনি।
১৯৪০ সালের ৭ নভেম্বর যশোরে জন্মগ্রহণ করেন কাজী শাহেদ আহমেদ। প্রকৌশলবিদ্যায় পড়ালেখা শেষে তিনি ১৪ বছর সেনাবাহিনীতে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমির প্রতিষ্ঠাকালীন প্লাটুন কমান্ডারদের একজন তিনি।
চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় মন দেন কাজী শাহেদ আহমেদ। ১৯৭৯ সালে “জেমকন গ্রুপ” প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তার ব্যবসায়িক জীবন শুরু। যে প্রতিষ্ঠানটি সৃষ্টি করেছে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান। তার প্রতিষ্ঠিত জেমকন গ্রুপ বেশকিছু ব্যবসায় উদ্যোগের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিও রেখে চলেছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বাংলাদেশে প্রথম অর্গানিক চা বাগানের প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।
দেশে আধুনিক শিক্ষার প্রসারে কাজী শাহেদ আহমেদ প্রতিষ্ঠা করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় “ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ”। ইউল্যাব নামে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের বাতিঘর। তার আরেকটি অলাভজনক উদ্যোগ “কাজী শাহেদ ফাউন্ডেশন”। যে ফাউন্ডেশন থেকে প্রতিবছর উপকৃত হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ।
এতকিছু করেও ভাঁটা পড়েনি এই কিংবদন্তীর সৃজনশীল চর্চায়। সোনার কাঠির ছোঁয়া রেখেছেন দেশের ক্রীড়া ও সাহিত্য অঙ্গনেও। দেশের অন্যতম ক্রীড়া সংগঠন আবাহনী ক্লাব পুনর্গঠনে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
সাহিত্য পরিমণ্ডলেও তিনি সুপরিচিত। কাজী শাহেদ আহমেদের প্রথম গ্রন্থ “আমার লেখা” ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয়। সে বছরই “ঘরে আগুন লেগেছে” বইটিও প্রকাশিত হয়। ২০১৩ সালে তার ৭৩ বছর বয়সে প্রথম উপন্যাস “ভৈরব” প্রকাশিত হয়। আত্মজীবনী “জীবনের শিলালিপি” প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে। একই বছর প্রকাশিত হয় উপন্যাস “পাশা”। ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় উপন্যাস “দাঁতে কাটা পেনসিল”। ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় উপন্যাস “অপেক্ষা”। ইতোমধ্যে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে “ভৈরব”। অনুবাদের অপেক্ষায় রয়েছে আরও বেশকিছু গ্রন্থ।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠ ছিলেন কাজী শাহেদ আহমেদ। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর যখন অনেকেই প্রকাশ্যে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির বিপক্ষে কথা বলতেন না, সেই প্রতিকূল সময়েও কলম ধরেছেন তিনি, কণ্ঠে রখেছেন “জয় বাংলা’ স্লোগান।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে প্রথম মামলা করেছিলেন নির্ভীক যোদ্ধা কাজী শাহেদ আহমেদ । নিজের আপন ছোট ভাইকে হত্যার দায়ে একাত্তরে পাকিস্তানের দোসর গোলাম আযমের বিরুদ্ধে যশোরে মামলা করেছিলেন তিনি। ১৯৯৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর যশোর জজকোর্টে গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে মামলা করেন তিনি।
সুদূরপ্রসারী চিন্তার অধিকারী কাজী শাহেদ আহমেদ তার সন্তানদেরও গড়ে তুলেছেন নিজের যোগ্য উত্তারসূরী হিসেবে। স্ত্রী বিশিষ্ট রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী আমিনা আহমেদ ও কাজী শাহেদ আহমেদ দম্পতির তিন ছেলে। বড় ছেলে কাজী নাবিল আহমেদ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদ এবং যশোর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। মেজো ছেলে কাজী আনিস আহমেদ খ্যাতিমান লেখক। তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউন, ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন ও সাহিত্য পত্রিকা বেঙ্গল লাইটস-এর প্রকাশক। ছোট ছেলে কাজী ইনাম আহমেদ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক।
দেশ ও মানু্ষের জন্য কাজী শাহেদ আহমেদ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, তা কিছুটা আঁচ করা যায় তার মৃত্যুতে মানুষের শোক প্রকাশ দেখে। ২৮ আগস্ট রাতে তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ঢল নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শোক প্রকাশ করেন প্রায় সকল শ্রেণি-পেশার নেতৃস্থানীয়দের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ।
কাজী শাহেদ আহমেদের মৃত্যৃতে শোকপ্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন, জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের এমপি, নৌ-প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক‘সহ অনেকে।



